সতীদাহ: ধর্মীয় বিধান না সামাজিক রীতিনীতি? রামমোহন রায়ের বিদ্রোহ ও হিন্দু সমাজের সংস্কার

সতীদাহ প্রথা, যেখানে একজন বিধবা স্ত্রীকে তার স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়, দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল। যদিও এই প্রথার ধর্মীয় গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি হিন্দু সমাজের কিছু অংশে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে, রামমোহন রায় এই নিষ্ঠুর প্রথার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে সতীদাহ হিন্দু ধর্মগ্রন্থে সমর্থিত নয় এবং এটি নারীদের উপর অমানবিক অত্যাচার। রামমোহন রায়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে, ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ ভারত সরকার সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে। এই ঐতিহাসিক ঘটনা হিন্দু সমাজের একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত ছিল। এটি নারীদের অধিকার এবং লিঙ্গ সমতার দিকে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল। রামমোহন রায়ের সাহসী নেতৃত্ব এবং অবিচল প্রতিশ্রুতি ভারতীয় উপমহাদেশে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সংস্কারের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে চলেছে।

Apr 21, 2024 - 12:00
Apr 21, 2024 - 00:24
 0  6
সতীদাহ: ধর্মীয় বিধান না সামাজিক রীতিনীতি? রামমোহন রায়ের বিদ্রোহ ও হিন্দু সমাজের সংস্কার
সতীদাহ: ধর্মীয় বিধান না সামাজিক রীতিনীতি? রামমোহন রায়ের বিদ্রোহ ও হিন্দু সমাজের সংস্কার | প্রতীকী ছবি

প্রথা আর রীতিনীতি কখনো এক নয়। প্রথা সময়ের সাথে সংস্কার হয়ে যায় অথবা সংস্কার করতে হয়। প্রথার কোন ধর্মীয় সর্বজনীন স্বীকৃত গ্রহনযোগ‍্য দলিল থাকে না। এগুলো কখনো কোন এক অজানা কারনে সমাজে চালু হয়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় চালু থাকার কারনে এগুলোকে ধর্মীয় রীতিনীতির মত মনে হয়। আসলে এগুলো ধর্মের কোন অপরিহার্য পালনীয় বিষয় নয়। এগুলোর মতই এক প্রথা হিন্দু সমাজে ছিল সতীদাহ প্রথা।


এই প্রথার জন্ম যখন সাধারণ হিন্দু নারীরা বলি হচ্ছিল তখন তখনই সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আইন পাস হয়েছে, রীতিনীতির বিরুদ্ধে নয়। আমাদের মধ্যে অনেকেই না জেনে হিন্দুদের ধর্ম নিয়ে মিথ্যা কথা বলেন এবং যারা বলেন আমার মনে হয় তারা জেনে বুঝে হিন্দুদের
 কে কালিমা লেপন এর উদ্দেশ্য এসব কথা বলেন। তারা কি জানেন ৫ হাজার বছর আগে মহাভারতের যুগে বিধবা মহিলা ছিল যাদের সতীদাহ করানো হয়নি?


মাতা কুন্তী বিধবা ছিল মহাভারতে আছে। রামায়নে আছে রাজা দশরথের মৃত্যুর পর তার স্ত্রীদের কারো সতীদাহ করানো হয়নি। তাহলে কি করে আপনারা এই সব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। আপনারা অনেকেই প্রচলিত মিথ্যা তত্ত্বের ভিত্তিতে সতীদাহ প্রথা নিয়ে মনগড়া মন্তব্য করে হিন্দু সমাজ কে ছোট করেন।


সতীদাহ প্রথার চালুর পিছনে যে বিষয়েগুলো কাজ করেছিল
 সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারতীয় উপমহাদেশে বাহির হতে বিভিন্ন আগ্রাসী দখল এসে উপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদ সহ তাদের রীতিনীতি হিন্দুদের উপর চাপিয়ে দিয়ে ধর্মান্তর করন শুরু করলো তখন নিরুপায় হয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই কু-প্রথা প্রবেশ করে


এই সত‍্য বুঝতে হবে যে এর সাথে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থের কোন সম্পর্ক নেই। ধর্মে এই প্রথা নেই। এগুলো যারা যুগে যুগে ধর্মের নামে রাজনীতির 
নামে শাসন এর নামে মানুষ কে শোষন করেছে এই শোষক ধান্দাবাজদের কাজ। এই শ্রেণি প্রমাণ করতে সমর্থ হয়নি হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থে সতীদাহ প্রথার কথা বলা হয়েছে।


কেউ যখন সনাতন ধর্মের কাউকে ধর্মান্তরিত করতে চায় সেই ব‍্যক্তি প্রথম যে কাজটি করে প্রথমে বুঝাতে চাইবে সনাতন ধর্মে রক্ষণশীল কৌলিণ‍্য প্রথা
, ব্রাহ্মণ‍্যবাদ আছে এই কথা বলে আপনি যেহেতু হিন্দু ধর্ম সমন্ধে ভালো কিছু জানেন না আপনার মনে সনাতন ধর্মের একটি ঋণাত্বক ধারণা সৃষ্টি করবে


তারপর সময় সুযোগ বুঝে হিন্দু ছেলে বা মেয়েকে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বসবে। আর এরই ধারাবাহিকতা 
এই কু-প্রথার বলি হয়েছে বেশিরভাগ ব্রাহ্মণ সমাজের মেয়েরা তাই এই ব্রাহ্মণ মেয়েদের এমন ভাবে অত‍্যাচারীত হতে দেখে এই প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসলেন ব্রাহ্মণ গৃহে জন্ম গ্রহনকারী রাজা রামমোহন রায়।


রাজা রামমোহন রায়ের
 হাত ধরে আবার হিন্দুদের পুরানো শোর্যবীর্যের রামায়ন ও মহাভারতের আলোকে বিধবাদের রক্ষা করা হয়। এই যে প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা সেটি কখনো সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের দ্বারা সম্ভব হয়নি যার মাধ্যমে হয়েছে তিনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণ ছিলেন।


এর জ
ন্য ‘লন্ডন-আমেরিকা-আরব হতে কোন বিধিবিধান হিন্দুদের ধার কর্জ করে আনতে হয়নি। তিনি দেখিয়েছেন হিন্দুদের বেদ হতে রামায়নে ও মহাভারতে কিভাবে বিধবা নারীদের জীবন যাপনের কথা বলা আছে তিনি যখন ব্রিটিশ আদালতে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করলেন তখন ব্রিটিশ বিচারক অবাক হয়েছেন এবং তিনি উপল্বদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন।


হাজার হাজার বছর আগের বেদ
, পুরান, মহাভারত, রামায়ন কত সমৃদ্ধ। কিন্তু যারা বিরোধিতা করেছিল তারা কেউ সতীদাহের পক্ষে কোন হিন্দুদের ধর্ম গ্রন্থ উপস্থাপন করতে পারেনি বরং এত হাজার বছরের পুরানো সকল ধর্ম গ্রন্থ বিধবাদের জীবন ধারনের পক্ষে ছিল


আসলে এই
সতীদাহ প্রথা বাতিল এর মাধ্যমে আমাদের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থের যে সত্য সুন্দর রূপ সেটি ব্রিটিশ আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সনাতন ধর্মের যে চিরন্তন ধারনা সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে যদি এই আইন প্রনয়নে অন্য কোন ধর্মের ধর্মগ্রন্থ রেফারেন্স হিসেবে গ্রহন করতে হতো তাহলে সেই ব্রিটিশ আমলে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ক এর মাধ্যমে কিন্তু রাজা রামমোহন রায়ের মত মহান পন্ডিত এর পক্ষে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছিলহিন্দুদের ধর্মের অতীত সমৃদ্ধের কথা


এই আইন আবার নতুন করে বৈদিক আচার বলুন আর সনাতন ধর্মের সঠিক পথ বলুন সব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিতে পেরেছে আমাদের। 
সনাতন ধর্ম যুগে যুগে মুনি-ঋষিদের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে এই বিষয়ে শ্রীমদভগদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে শুনতে পাই,



শ্রীমদ্ভগবদগীতা -
চতুর্থ অধ‍্যায় হতে বর্ণিত

यदा यदा हि धर्मस्य ग्लानिर्भव- ति भारत

अभ्युत्थान- मधर्मस्य तदात्मानं सृजाम्यहम्- ॥-

परित्राणाय- साधूनां विनाशाय दुष्कृताम्- ।

धर्मसंस्था- पनार्थाय सम्भवामि युगे युगे-


অনুবাদ

হে ভারত! যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই। সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই



পঞ্চম অধ‍্যায় হতে বর্ণিত

नादत्ते कस्यचित्पापं चैव सुकृतं विभुः

अज्ञानेनावृतं ज्ञानं तेन मुह्यन्ति जन्तवः१५


ज्ञानेन तु तदज्ञानं येषां नाशितमात्मनः

तेषामादित्यवज्ज्ञानं प्रकाशयति तत्परम्१६


तद्बुद्धयस्तदात्मानस्तन्निष्ठास्तत्परायणाः

गच्छन्त्यपुनरावृत्तिं ज्ञाननिर्धूतकल्मषाः१७


विद्याविनयसम्पन्ने ब्राह्मणे गवि हस्तिनि

शुनि चैव श्वपाके पण्डिताः समदर्शिनः१८॥’



অনুবাদ

পরমেশ্বর ভগবান জীবের পাপ অথবা পুণ্য কিছুই গ্রহণ করেন না। অজ্ঞানের দ্বারা প্রকৃত জ্ঞান আবৃত হওয়ার ফলে জীবসমূহ মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। জ্ঞানের প্রভাবে যাঁদের অজ্ঞান বিনষ্ট হয়েছে, তাঁদের সেই জ্ঞান অপ্রাকৃত পরমতত্ত্বকে প্রকাশ করে, ঠিক যেমন দিন শেষে সূর্যের উদয়ে সব কিছু প্রকাশিত হয়।


যার বুদ্ধি ভগবানের প্রতি উন্মুখ হয়েছে
, মন ভগবানের চিন্তায় একাগ্র হয়েছে, নিষ্ঠা ভগবানের দৃঢ় হয়েছে এবং যিনি ভগবানকে তাঁর একমাত্র আশ্রয় বলে গ্রহণ করেছেন, জ্ঞানের দ্বারা তাঁর সমস্ত কলুষ সম্পূর্ণরূপে বিধৌত হয়েছে এবং তিনি জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছেন।
 জ্ঞানবান পন্ডিতেরা বিদ্যা-বিনয়সম্পন্ন ব্রাহ্মণ, গাভী, হস্তী, কুকুর ও চন্ডাল সকলের প্রতি সমদর্শী হন


সনাতন অর্থ চিরন্তন এই চিরন্তন ধর্ম কোন মানুষের হাত ধরে পৃথিবীতে যাত্রা শুরু করেনি যে কারনে কোন মানুষের কথায় এই ধর্ম পৃথিবীতে নিশ্চহ্ন হবে না। রাক্ষস এর বিরুদ্ধে আমাদের সত‍্য সুন্দর সৌহার্দ্য ধারন করে টিকে থাকতে হবে


এর জন্য সনাতন সমাজে সকল মত ও পথকে সাথে নিয়ে সমন্বয়ের সাথে টিকে থাকতে হবে। আমাদের মেয়েদের যে অধিকার সেগুলো আমাদের সনাতন শাস্ত্রের যে গ্রন্থ আছে সেগুলোর আলোকেই আমরা মেয়েদের প্রদান করবো এর জন‍্য নতুন কোন আইনের প্রয়োজন নেই

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow

মহাদেব কুমার আমি একজন ছাত্র। অনার্স চতুর্থ বর্ষ উদ্ভিদ বিদ্যা শাখা নওগাঁ সরকারি কলেজ। পড়াশুনা পাশাপাশি কৃষি কাজ করি।