সূরা তাওবায় বিসমিল্লাহ নেই কেন?

রাসূল (সাঃ) তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর, তিনজন সাহাবি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। তাদের তওবা কবুল হয়নি এবং তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ৪০ দিনের মানসিক যন্ত্রণার পর, আল্লাহ তায়ালা তাদের তওবা কবুল করেন। এই আর্টিকেলে, আমরা তাদের অসাধারণ তওবার ইতিহাস, সূরা তাওবায় বিসমিল্লাহ না থাকার কারণ এবং এই ঘটনা থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি তা আলোচনা করব।

Apr 21, 2024 - 18:00
Apr 21, 2024 - 01:43
 0  8
সূরা তাওবায় বিসমিল্লাহ নেই কেন?
সূরা তাওবায় বিসমিল্লাহ নেই কেন?

সূরার নাম তাওবা, এই সূরার মধ্যে ৩ জন সাহাবির তওবার বিশেষ ইতিহাস আছে। এই ৩ জন সাহাবি হলেন: (১) ক্বাব ইনবে মালেক (২) হেলাল ইবনে উমাইয়া এবং (৩) মেরারা ইবনে রাবিয়া। রাসূল (সাঃ) তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর এই ৩ জন সাহাবি রাসূল (সাঃ) এর কাছে গিয়ে সত্য কথা বলেছিলে।


তাঁরা বলেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের কোনো ওজর ছিলনা
, আমরা অবহেলা করে যুদ্ধে যাইনি, আপনি আমাদের ক্ষমা করে দেন। তারপর এই ৩ জন সাহাবি তওবা করেছিলেন, তাদের তওবা কবুল হয়েছিল এবং তাদের তওবা কবুল হওয়ার উপরই এই সূরার নাম রাখা হয়েছে সূরা তওবা


সূরা তাওবায় বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম নেই কেন?

আল কোরআনের সকল সূরার প্রথমে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আছে, কিন্তু সূরা তাওবায় বিসমিল্লাহ নেই। আবার সূরা নামলে ২ বার বিসমিল্লাহ আছে। সূরা নামলে হযরত সোলায়মান (আঃ) যখন রানী বিলকিস কে চিঠি লিখেছিলেন, সেই চিঠির উপরে তিনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লিখেছিলেন। এইজন্য সূরা নামলে ২ বার বিসমিল্লাহ আছে।


সূরা তাওবায় বিসমিল্লাহ না থাকার কারণ: হযরত ওসমান (রাঃ) বললেন ওহী নাযিল হওয়ার পরে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমাদের লিখতে বলেছেন
, আমরা লিখে নিয়েছি।
এই সূরাটা হলো সর্বশেষ সূরা। এই সূরার ঘটনাবলি ও বিষয়বস্তু সূরা আনফালের সাথে মিলিত, সেই জন্য সূরা আনফালের পরে এই সূরাটা সাজানো হয়েছে।


আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমাদের কে এই সূরাতে বিসমিল্লাহ লিখতে বলেননি এইজন্য আমরা বিসমিল্লাহ ছেড়ে দিয়েছি। এই সূরা বিসমিল্লাহ না থাকার কারণ হিসেবে তাফসিরকারকরা বলেন
, বিসমিল্লাহ হচ্ছে আল্লাহর রহমতে নিদর্শন। আর এই সূরাটা হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে অসন্তুষ্টির ঘোষণা


মুশরিকদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তাদের সাথে যে সন্ধি চুক্তি হয়েছিল কোন কোন ক্ষেত্রে সেই সন্ধি ভঙ্গ করার অনুমতি এই সূরায় দেওয়া হয়েছে। এই জন্য বিসমিল্লাহ হচ্ছে রহমত আর এই সূরাটা রহমত নিয়ে আসে নাই।


এই সূরাকে বলা হয় সুরাতুল গজব। অর্থাৎ আল্লাহর রাগের সূরা, গোশসার সূরা। এই সূরায় অধিকাংশ কথাগুলো আল্লাহতায়ালা রাগান্বিত হয়ে বলেছেন। আল্লাহতালা এই সূরার মধ্যে অধিকাংশ মুনাফিকদের কথা তুলে ধরেছেন


রাসূল (সাঃ) এর আমলে মদিনাতে অন্তত ৮২ জন মুনাফেক ছিল। আল্লাহ তায়ালা এই সূরার মধ্যে অধিকাংশ মুনাফিকদের নাম উল্লেখ করে করে বলেছেন। রাসূল (সাঃ) জুমার খুতবায় মুনাফিকদের নাম উল্লেখ করে করে মসজিদ থেকে বের করে দিয়েছে। কিন্ত পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা এই নাম গুলো রহিত করেছেন। এবং রাসূল (সাঃ) কে এই নাম গুলো রহিত করতে বলেছেন।


এইজন্য যে
, যারা মুনাফেক ছিল তাদের অনেকেরই সন্তান খাঁটি মুসলিম ছিল। কাজে এখন তাদের বাবাদের পরিচয় যদি মুনাফেক হিসেবে কোরআনে লিপিবদ্ধ থাকে, এই সন্তানেরা সমাজে পদে পদে অপমানিত হবে, এই জন্য আল্লাহ তায়ালা এই সন্তানের জন্য তাদের পিতাদের মুনাফেকির বিষয়টা স্পষ্ট করে দেওয়ার পরও অস্পষ্ট করে দিয়েছেন। মোট কথা এই সূরাটা হচ্ছে সুরাতুল গজব, আল্লাহ অসন্তুষ্টির সূরা। এই জন্যই এই সূরাতে বিসমিল্লাহ বলা হয়নি


৩ জন সাহাবির তাওবার আশ্চর্য ঘটনা

রাসূর (সাঃ) তাবুক যুদ্ধ থেকে মদিনায় ফিরে আসার পরে, এই ৩ জন সাহাবি (১) ক্বাব ইনবে মালেক (২) হেলাল ইবনে উমাইয়া এবং (৩) মেরারা ইবনে রাবিয়া আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর কাছে সত্য কথা বলেছিলেন। তারা বলেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের কোনো ওজর ছিল না, ধন সম্পদের অভাব ছিলনা, সাস্থগত কোনো ত্রুটি ছিলনা। তাবুক যুদ্ধে যাবো যাবো করে আমরা যতে পারিনি, পিছনে পরে ছিলাম এটাই সত্য কথা


তখন এই ৩ জন সাহাবির ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) বললেনঃ ঠিক আছে তোমরা যাও দেখো আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ব্যাপারে কি ফয়সালা দেয়। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মদিনার সাধারণ মুসলমানদের বললেন, তোমরা এই ৩ ব্যাক্তির সাথে কথাবার্তা বলবেনা, সালাম দিবেনা, ওদের সালামের জবাবও নিবেনা। এই ভাবে তাদেরকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হলো। এইভাবে তাদের সময়টা পার হতে লাগলো।


আল্লাহ তায়ালা বলেন: وَّ عَلَی الثَّلٰثَۃِ الَّذِیۡنَ خُلِّفُوۡا ؕ حَتّٰۤی اِذَا ضَاقَتۡ عَلَیۡهِمُ الۡاَرۡضُ بِمَا رَحُبَتۡ وَ ضَاقَتۡ عَلَیۡهِمۡ اَنۡفُسُهُمۡ وَ ظَنُّوۡۤا اَنۡ لَّا مَلۡجَاَ مِنَ اللّٰهِ اِلَّاۤ اِلَیۡهِ ؕ ثُمَّ تَابَ عَلَیۡهِمۡ لِیَتُوۡبُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ


অর্থ: এবং অপর ৩ জনকে যাদেরকে পিছনে রাখা হয়েছিল
, পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো,আর তারা বুঝতে পারল যে আল্লাহ ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি রাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা দয়াময় ও করুণাশীন। (সূরা তাওবা, আয়াত-১১৮)


এই আয়াতে তিন ব্যাক্তির কথা বলা হয়েছে। মদিনায় মুনাফিকের সংখ্যা ছিল ৮০ জনের উপর। অধিকাংশ তাফসির কারকদের মতে ৮২ জন। রাসূল (সাঃ) তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পরে
, এরা সবাই ওজর পেশ করলেন, হুজুর আমার মেয়ের বিবাহ ছিল, হুজুর আমার ফসল পেকেছিল, হুজুর আমি অসুস্থ ছিলাম এইভাবে বলতে লাগলো। তখন রাসূল (সাঃ) বললেন ঠিক আছে তোমাদের জন্য আল্লাহ কাছে ক্ষমা চাইব দেখো আল্লাহ কি করে


তারা সবাই মিথ্যা বলেছে। কিন্তু এই ৩ জন সাহাবি এরা ৩ জন মদিনার আনসার। এর মধ্যে ক্বাব ইবনে মালেক ছাড়া অন্য দুইজন বদরী সাহাবি বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই ৩ জনের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলছেন তাদের বিষয়টা মুলতবি রাখা হয়েছিল। ৪০ দিন পার হয়ে যাওয়ার পর, রাসূল (সাঃ) বললেন তোমরা তোমাদের স্ত্রী থেকে পৃথক হয়ে যাও


এইভাবে ৪০ দিন পার হয়ে ৫০ দিনের রাতের শেষ তৃতীয়াংশে তওবা কবুল হওয়ার এই আয়াত নাযিল হল। ঐ সময় রাসূল (সাঃ) উম্মে সালমা রাঃ এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। রাসূল (সাঃ) উম্মে সালমাকে ডেকে বললেন। ক্বাব ইনবে মালেক, হেলাল ইবনে উমাইয়া, মেরারা ইবনে রাবিয়ার তওবা আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন। তখন উম্মে সালমা (রাঃ) বললেন ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমি কি লোক পাঠিয়ে বিষয়টা জানায়া দিব?


রাসূল (সাঃ) বললেন না এখন না
, এখন যদি এই খবরটা পৌঁছানো হয়, তাহলে সাহাবাদের মধ্যে একটা শোরগোল সৃষ্টি হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষদের ঘুম নষ্ট হয়ে যাবে। তারপর রাসূল (সাঃ) মদিনার মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করে সকল সাহাবিদের মধ্যে এই ঘোষণা দিলেন যে তিনজন সাহাবীর ব্যাপার মুলতবি রাখা হয়েছিল আল্লাহ তায়ালা তাদের তওবা করে আয়াত নাযিল করেছেন


রাসূল (সাঃ) ক্বাব ইবনে মালেককে কাছে ডাকলেন, এবং বললেন তোমার মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হওয়ার পরে আজকের দিনের মত এই রকম শুভ দিন তোমার আর আসেনি। তোমার জন্য সুসংবাদ। এই ভাবে তাদের তওবা কবুল হয়েছে, আল্লাহ তওবা কবুল করেছেন। এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সূরাটার নাম হয়েছে সুরাতুত তওবা

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow