মক্কাবাসীদের অসহযোগিতা: রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবীদের কষ্টের তিন বছর

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর উপর নাজরানের অসহযোগিতা ও হত্যার চেষ্টার প্রতিশোধ: ক্ষমা, বিচার এবং দুর্ভিক্ষের কাহিনী।

Apr 22, 2024 - 15:00
Apr 22, 2024 - 00:46
 0  15
মক্কাবাসীদের অসহযোগিতা: রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবীদের কষ্টের তিন বছর
মক্কাবাসীদের অসহযোগিতা: রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবীদের কষ্টের তিন বছর

আল্লাহর রাসূলকে নবুয়তের ৭ম থেকে ১০ম, এই তিন বছর পর্যন্ত শিয়াবে আবু তালিবে মুশরিকরা বন্দী করে রেখেছিল। রাসূল (সাঃ) এবং সাহাবীদের খুব কষ্ট হয়েছে, তাদের সাথে ওরা ব্যবসা-বাণিজ্য লেনদেন সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছিল। এবং একটা চুক্তিনামা ওরা লিখেছিল, Non Cooperation Movement (অসহযোগ আন্দোলন)। যে আমরা মোহাম্মদ (সাঃ) এবং তার সাথীদের সাথে, কোন লেনদেন বেচাকেনা ব্যবসা-বাণিজ্য আমরা করব না।


এবং এটা তারা লিখে কাবা ঘরের দেয়ালে লটকাইয়া রেখেছিল। এই লেখাটার উপরে ছিল (বি ইসমিকা আল্লাহুম্মা) হে আল্লাহ তোমার নামে শুরু করছি। কোরআন নাজিল হওয়ার আগে আরবের লোকেরা সব কাজ শুরু করতো (বি ইসমিকা আল্লাহুম্মা) বলে এর অর্থ বিসমিল্লাহ এর মতই কিন্তু পবিত্র কোরআনের আয়াত না। তো ওরা ওটার উপরে বি ইসমিকা আল্লাহুম্মা লিখে রেখেছে, আর আর নিচে লিখে রেখেছে মোহাম্মদ (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের সাথে আমাদের কোন লেনদেন বেচাকেনা হবে না।


এভাবে তারা নবুয়তের সপ্তম থেকে দশম এই তিন বছর পর্যন্ত রাসুল সাঃ কে শিয়াবে আবু তালিব গিরি গুহায়
আবদ্ধ করে রেখেছিল। এই সময় মুসলমানদের জন্য সবচাইতে কষ্টকর জীবন পার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিবি খাদিজা ইন্তেকাল করেছেন, প্রথমে আবু তালিব নবুয়তের দশম বছরে ইন্তেকাল করেছেন তারপর অল্প দিনের ব্যবধানে বিবি খাদিজা (রাঃ) ও ইন্তেকাল করেন। সাহাবায়ে কেরামরা গাছের পাতা খেয়ে জীবনধারণ করতেন, তাঁবুর চামড়া সিদ্ধ করে খেতে বাধ্য হয়েছেন।


বাইরে থেকে খাদ্য আমদানি করা ছাড়া এদের কোন উপায় ছিল না
, কারণ মক্কায় কোন ফসল উৎপাদন হতো না। যারা ব্যবসা বাণিজ্য করে, তারা বলছে ওদের কাছে আমাদের পণ্য বেচবো না। এভাবে তিনটা বছর পার হয়ে যাওয়ার পর, আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সাঃ) কে জানিয়ে দিলেন ওরা যে চুক্তিনামাটা লটকিয়েছে ওখানে সবগুলো লেখা উইপোকা খেয়ে ফেলেছে শুধু বি ইসকিমা আল্লাহুম্মা লেখাটা আছে।


তখন রাসূল (সাঃ) চাচাকে এই কথাটা বললেন। এরপর আবু তালিব ওদেরকে ডেকে বললেন আমাদের মধ্যে অসহযোগ আন্দোলনের চুক্তি নামা লটকাইছো কাবা ঘরে
, সেটা তো নষ্ট হয়ে গেছে উইপোকা খেয়ে ফেলেছে।


তখন ওরা বলে এরা তো গুয়া থেকে বের হয়নি এরা এটা জানলো কি করে
, চলো তো আমরা দেখি যেয়ে দেখে কাবা ঘরে আসলেই বি ইসমিকা আল্লাহুম্মা (আল্লাহ তোমার নামে শুরু করছি) এই লেখাটুকু আছে আর সব লেখা খেয়ে ফেলেছে। এরপর তারা দারুন নদওয়ায় বৈঠকে বসলো। আমরা কি নতুন ভাবে আবারো অসহযোগ আন্দোলন করবো? তাদের কি আবার অবরুদ্ধ করবো? তাহলে তো আবার নতুন করে এই চুক্তি জমা করতে হবে। আগেরটা তো পোকায় খেয়ে ফেলেছে। এইটা নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা গেল।


এবং বিশেষ বিশেষ মুসরিকদের কিছু নেতা এটার বিরোধিতা করলো। তারা বলল
, যারা গুহার মধ্যে অবরুদ্ধ এবং তারা মৃতপ্রায় অবস্থায় আছে। আমাদের এ লোকগুলা তো বাহিরের কেউ নয়, এরা আমাদের আত্মীয়-স্বজন। এদের সাথে কোন না কোন ভাবে আমাদের আত্মীয়তা আছে সম্পর্ক আছে। কাজেই এই লোকগুলো এভাবে মরে যাবে এটা আমরা চাই না।


এদের বিরুদ্ধে আর অসহযোগ আন্দোলন করবো না। তো এইভাবে কিছু লোকের পরামর্শে ৩ বছরের অসহযোগ আন্দোলনটা ভেঙ্গে গেল। আল্লাহর রাসূল গুহার থেকে বের হলেন
, এবং ঐ সময়ের মধ্যে আল্লাহ রাসুলের চাচা আবু তালেব মারা গেলেন, এরপর বিবি খাদিজা মারা গেলেন। এবং ঐ বছরের এক অংশে আল্লাহ রাসুল তায়েফে গিয়েছিলেন।



এই যে মুসলমানদেরকে তারা তিন বছর অবরুদ্ধ রেখেছিল তার প্রতিশোধ আল্লাহ কিভাবে নিয়েছে পড়ুন

মদিনায় হিজরত করার পর আল্লাহর রাসূলকে গোপনে হত্যা করার জন্য, ভন্ড নবীদের সরদার মুসাইলামা কাযযাব সে একটা লোককে ঠিক করেছে, সেই লোকটা ছিল নাজরান গোত্রের নেতা তার নাম সুমামা ইবনে উসাল। তার অধীনে ১ লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য ছিল। তো মুসাইলামা কাযযাব সুমামা ইবনে উসাল কে বলেছে তুমি মোহাম্মদ সাঃ কে হত্যা করবে, ও তখন রাজি হয়ে গেল ঠিক আছে আমি হত্যা করবো।


এরপর সুমামা ইবনে উসাল আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার জন্য মদিনায় চলে আসলো। মদিনায় আসার পরে আল্লাহর রাসূলের প্রহরী মোহাম্মদ ইবনে মুসলিম আনসারী তার হাতে আটক হলেন। এদিকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন গোটা কোরআন প্রচার না করা পর্যন্ত কোন মানুষ আপনার কিছু করতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন
,


یٰۤاَیُّهَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ؕ وَ اِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَهٗ ؕ وَ اللّٰهُ یَعۡصِمُکَ مِنَ النَّاسِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یَهۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ


অর্থঃ হে রাসুল পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে। আর যদি আপনি তা না করেন, তবে আপনি তার পায়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের পথ দেখান না। (সূরা মায়েদা, আয়াত-৬৭)


এই আায়ত নাযিল হওয়ার পর রাসুল (সাঃ) তার পাহারাদারদেরকে ডেকে বিদায় করে দিলেন। এর আগে সাহাবিরা প্রতি রাতে আল্লাহর রাসুলকে পালাক্রমে পাহারা দিতেন। তো এখানে আল্লাহ হেফাজতের ওয়াদা করেছেন
, তারপরও আল্লাহর রাসূলের পাহারাদারের জন্য মোহাম্মদ ইবনে মুসলিম আনসারি সার্বিকভাবে সব সময় আল্লাহর রাসূলের পাহারাদারের দায়িত্ব নিয়োজিত ছিলেন।


সুমামা ইবনে উসাল যখন রাসূল (সাঃ) কে হত্যা করার জন্য গেছেন
, তখন মুসলিম আনসারির হাতে ধরা পরে গেল। সে নাজরানের লোক সে আল্লাহর রাসূলকে গুপ্ত হত্যা করবে সেজন্যে মদিনায় এসেছে। তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হলো। এর পরে আল্লাহর রাসূল যখন নামাজে আসলেন, নামাজ শেষে তাকে জিজ্ঞেস করলেন সুমামা তুমি আমার থেকে কি ধরনের আচরণ আশা কর?


তখন সুমামা উত্তর দিন
, ইয়া রাসুলুল্লাহ আমি আপনাকে হত্যা করার জন্য এসেছি এবং ধরা পরেছি, আমার উপর ন্যায় বিচার হলো যে আপনি আমাকে হত্যা করতে পারেন। যেহেতু আমি আপনাকে হত্যা করার জন্য এসেছি। এটা আপনার অধিকার এবং ন্যায়বিচার। কিন্তু আপনি যদি আমাকে হত্যা না করেন ক্ষমা করে দেন, তাহলে আমি আপনার জন্য এমন কাজ করব যা দেখে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। ঐ দিন পার হয়ে গেল রাসূল (সাঃ) কোনো জবাব দিলেননা।


পরের দিন রাসূল (সাঃ) একই কথা জিজ্ঞেস করলেন। সুমামা একই উত্তর দিলেন। দ্বিতীয় দিনও রাসূল (সাঃ) কিছু বললেন না। তৃতীয় দিন আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন
, সুমামা একই উত্তর দিলেন যে আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে হবে ন্যায় বিচার। আর যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করেন আমি এমন কাজ করবো যা দেখে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। তখন রাসূল সাঃ বললেন যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।


এই কথা বলার সাথে সাথে মদিনার মসজিদের নিকটতম স্থানে পানির কুপ ছিল
, সুমামা সেখানে গোসল করে পরিত্র হয়ে কালেমা পরে মুসলমান হয়ে গেল। মুসলমান হওয়ার পরে রাসূল (সাঃ) সাহাবাদের বললেন সুমামাকে তোমরা প্রশিক্ষণ দাও। প্রশিক্ষণ শেষে সুমামা নিজের দেশে চলে গেল। তারপর জাতির কাছে গিয়ে বললো যে আমি তোমাদের নেতা আমাকে যদি নেতা মানো, তাহলে আমি যা বলব তা মানতে হবে।


তারা বলল কি বলেন
, তখন সুমামা বললেন আমি মোহাম্মদ (সাঃ) কে বিশ্বাস করি আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছি। এখন আমার কথা হচ্ছে যে, এই মক্কাবাসীদের সাথে তোমাদের যে ব্যবসা আছে তোমরা গম রপ্তানি কর মক্কায়, আর ওদের থেকে চামড়া আমদানি করো। এটা আমি বলছি আজ থেকে যদি তোমরা আমাকে নেতা মানো তাহলে মোহাম্মদ সাঃ এর আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত একটা গমও মক্কায় রপ্তানি করবে না।


ওরা বলল ঠিক আছে আপনি যা বলনেন তাই হবে। তখন থেকে মক্কায় গম রপ্তানি বন্দ হয়ে গেল। মক্কায় তো গমের আবাদ হয়না সেই কারনে তারা দুর্ভিক্ষে পড়ে গেল। এমন দুর্ভিক্ষ শুরু হল
, যে পশম রক্তে ভিজে তা খাইত শুকনো তাবুর চামড়া সিদ্ধ করে খাইত। ঐ যে রকম আল্লাহর রাসূলকে তিন বছর আটকিয়ে রেখেছিল, সেই প্রতিশোধ আল্লাহ কিভাবে নিয়েছেন দেখেন।


এমন দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে যে তাদের বাঁচার কোন পথ ছিল না। কাকুর পর্যন্ত তারা খেতে বাধ্য হয়েছে। এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত দেখল যখন আর কোন উপায় নাই
, নাজরান থেকে কোন গম আমদানি হচ্ছে না তখন আবু সুফিয়ান কিছু লোকজন নিয়ে আল্লাহর রাসূলের কাছে হাজির হলেন। হাজির হয়ে বললেন হে মোহাম্মদ (সাঃ) আপনি মানুষের জন্য রহমত হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভাব হয়েছেন।


বদরের যুদ্ধে আমাদের সমস্ত বড় বড় নেতাকে হত্যা করেছেন। এখন বালক এবং যুবক যারা আছে তারাও কি সব মরে যাবে? আপনি যদি আমাদের গম সরবরাহের অনুমতি না দেন এরাও সব মরবে। এটা কি আপনি চান? আপনি রহমাতাল্লিল আলামিন আপনি আমাদের ক্ষমা করেন দয়া করেন।


আবু সুফিয়ান এভাবে আত্মসমর্পণ করার পরে আল্লাহর রাসূল তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এরপর সুমামা কে আদেশ দিলেন তুমি আগের মত গম সরবরাহ করা শুরু করে দাও। আগের মত এদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করো। এটাই হল তাদের জন্য কঠিন শাস্তি ও প্রতিশোধ।

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow