হুনাইনের যুদ্ধ: আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও সাহাবীদের বিজয়

এই নিবন্ধে, আমরা হুনাইনের যুদ্ধের বিশদ বিবরণ আলোচনা করব, যেখানে মুসলমানরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর ভরসা করে ভুল করে এবং প্রাথমিকভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু আল্লাহর সাহায্য ও নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর অটল বিশ্বাস ও সাহসের মাধ্যমে তারা শেষ পর্যন্ত বিজয় অর্জন করে।

Apr 22, 2024 - 16:00
Apr 22, 2024 - 00:55
 0  20
হুনাইনের যুদ্ধ: আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও সাহাবীদের বিজয়
হুনাইনের যুদ্ধ: আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ও সাহাবীদের বিজয় | প্রতীকী ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,


لَقَدۡ
نَصَرَکُمُ اللّٰهُ فِیۡ مَوَاطِنَ کَثِیۡرَۃٍ ۙ وَّ یَوۡمَ حُنَیۡنٍ ۙ اِذۡ اَعۡجَبَتۡکُمۡ کَثۡرَتُکُمۡ فَلَمۡ تُغۡنِ عَنۡکُمۡ شَیۡئًا وَّ ضَاقَتۡ عَلَیۡکُمُ الۡاَرۡضُ بِمَا رَحُبَتۡ ثُمَّ وَلَّیۡتُمۡ مُّدۡبِرِیۡنَ


অর্থঃ আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের প্রফুল্ল করেছিল, কিন্তু তা তোমাদের কোন কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেছিল। অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তোমরা পলায়ন করছিলে। [সূরা তাওবা, আয়াত-২৫]



শানে নুযূল

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ তোমাদের বহু স্থানে সাহায্য করেছেন। বদরের যুদ্ধে তোমাদের জন্য আল্লাহ তাআলা ফেরেস্তা নাযিল করে সাহায্য করেছেন। উহুদের ময়দানেও আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে সাহায্য করেছেন। তাছাড়া রাসুল কে ওরা মেরে ফেলত। উহুদের যুদ্ধে ভয়ংকর একটা অবস্থান মধ্য থেকে আল্লাহতালা তাঁর রাসূলকে হেফাজত করেছেন।


এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন বিশেষ করে হুনাইনের দিন। আল্লাহর রাসূল মক্কা বিজয় করেছেন ১৮ই রমজান
, এরপর তিনি ১০ দিন মক্কাতে ছিলেন। এরপর রাসুল সাঃ হুনাইনের যুদ্ধের জন্য রওনা করেছেন। হুনাইন জায়গাটার অবস্থান হল, মক্কা এবং তায়েফের মাঝখানে। মক্কা থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে তায়েফ  ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।


এই মক্কা এবং তায়েফের মাঝখানে হুনাইন। এখানে ছাকিব এবং হাওজিন নামক দুইটা গোত্র ছিল তারা খুব শক্তিশালী দল। তো মক্কা বিজয়ের পরপরই আল্লাহর রাসূল ছাকিব এবং হাওজিন গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হুনাইন প্রান্তরে অবস্থান নিয়েছিলেন। এবং সেই দিন আল্লাহতালা তার রাসূলকে এবং সাহাবীদেরকে কিভাবে সাহায্য করেছেন
, সে কথাটা আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে, তোমাদেরকে বহু জায়গায় সাহায্য করা হয়েছে বিশেষ করে হুনাইনের দিন।


এই দিনের অবস্থাটা কি ছিল
, তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ তোমাদেরকে আনন্দিত করে তুলেছিল। মানে এই হুনাইনের যুদ্ধে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল, ১২ হাজার। অর্থাৎ মক্কা বিজয়ের জন্য আল্লাহর রাসূল মদিনার থেকে ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে এসেছিলেন, এসে মক্কা জয় করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর হাজার হাজার লোক ইসলামের ভিতর প্রবেশ করেছে।


এখন এই নব মুসলিমদের মধ্য থেকে ২ হাজার লোক আল্লাহর রাসূলের সাথে হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাহলে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা হলো ১২ হাজার
, আর শত্রু সংখ্যা ছিল মাত্র ৪ হাজার। তাহলে তো মুসলমানেরা আনন্দ করবেই, এই যুদ্ধে আমরা জিতবো না তো কে জিতবে। আমরা বহুগুণ শত্রুর মোকাবেলা করে যুদ্ধ জিতেছি, তো আজকে আমরা ১২ হাজার  ওরা ৪ হাজার।


এ কারণে আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে বলেন
, তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদেরকে আনন্দিত করে তুলেছিল, যে আজকে আমরা জিতবই। কিন্তু তোমাদের এই সংখ্যাগরিষ্ঠ তোমাদের কোন উপকারিতায় আসে নাই। প্রশস্ত পৃথিবীটা তোমাদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছিল। অতঃপর তোমরা পিঠ দেখিয়ে সবাই পালাতে শুরু করেছিলে।


ছাকিব ও হাওয়াজিন এরা খুব দুর্ধর্ষ জাতি। এরা ৪ হাজার যোদ্ধা
, এদের পশু সম্পদ, সম্পদ স্ত্রী ছেলে-মেয়ে সব যুদ্ধের মাঠে নিয়ে এসেছে। তাদের বাড়িতে কিছুই নেই। তারা এমনভাবে যুদ্ধের পজিশন নিয়েছে যে, তারা শুধু ঝড়ের মতো তীর ছুড়েছে। তারা মুসলমানদের সামনে আসে নাই।


আরব দেশ তো পাহাড়ি জমি যেটাকে নজ বলা হয় মালভূমি
, এরা পাহাড়ের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে নিজেদের মধ্যে পজিশন নিয়ে শুধু তীর ছুড়েছে। এমন ভাবে তারা ঝড়ের মত পীর বর্ষণ করেছে যে, ১২ হাজার মুসলমান মাঠ থেকে পালিয়ে গেছে।



এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন
,


ثُمَّ
اَنۡزَلَ اللّٰهُ سَکِیۡنَتَهٗ عَلٰی رَسُوۡلِهٖ وَ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ اَنۡزَلَ جُنُوۡدًا لَّمۡ تَرَوۡهَا وَ عَذَّبَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ؕ وَ ذٰلِکَ جَزَآءُ الۡکٰفِرِیۡنَ


অর্থঃ তারপর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন তাঁর রাসূলের উপর ও মুমিনদের উপর এবং নাযিল করলেন এমন সৈন্যবাহিনী যাদেরকে তোমরা দেখনি
, আর কাফিরদেরকে আযাব দিলেন। আর এটা কাফিরদের কর্মফল। [সূরা তাওবা, আয়াত-২৬]


অতঃপর আল্লাহতালা তার রাসূলের উপরে আন্তরিক প্রশান্তি নাযিল করলেন। এবং মোমেনদের উপরও আল্লাহতালা প্রশান্তি নাযিল করলেন। এবং আল্লাহ তা
'আলা এমন সৈন নাযিল করলেন যে স্বর্ণগুলো তোমরা এর আগে কোনদিন দেখতে পাওনি। এবং আল্লাহ তা'আলা কাফেরদেরকে শাস্তি দিলেন, এবং কাফেরদের শাস্তি এটাই পুরস্কার এটাই।


যখন সমস্ত মুসলমান ময়দান ত্যাগ করে পালিয়ে গেল
, তখন ময়দানে আল্লাহর রাসূল একা, আল্লাহর রাসূলের দুলদুল নামে খচ্চর এটার একটা রশি ধরেছিল আবু সুফিয়ান, আর আরেক পাশে ধরেছিল আব্বাস রাঃ। আবু সুফিয়ান রাসুলের শ্বশুর + চাচাতো ভাই, আর আব্বাস (রাঃ) চাচা।


এই তিনজন ময়দানে ছিলেন
, রাসূল (সাঃ) একাই তার খচ্চর নিয়ে শত্রুদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন,আর ওরা দুইজন শুধু পিছন দিকে টেনে ধরছে, যেন আল্লাহর রাসূল একাই শত্রুদের ভিতর ঢুকে না যান। এবং এই সময় আল্লাহর রাসূল একটা ছন্দ পাঠ করেছিলেন তার জীবনে, কবিতাটির অর্থ হল এই (আমি নবী মিথ্যা নই, আমি সত্য নবী আমার সাথে আল্লাহর সাহায্য আছে পরাজিত হবে না।


আমি মুত্তালিবের সন্তান
, এই কথার দ্বারা তিনি এটা বুঝাতে চাচ্ছেন এই বংশের লোকেরা কোনদিন যুদ্ধের মাঠ থেকে পালায় না। রাসুল (সাঃ) এর যে বংশ বনি হাশিম বনি মোতালিব, এই বংশের লোকেরা কোনদিন যুদ্ধের মাঠ থেকে পালায় না।এটা তাদের একটা বংশের ঐতিহ্য, যুদ্ধ করে জিতবে নয়তো শহীদ হয়ে যাবে, কিন্তু  যুদ্ধের মাঠ থেকে পালাবে না।


তো আবু সুফিয়ান নব মুসলিম মক্কা বিজয়ের একদিন আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আর আব্বাস (রাঃ) চাচা এইভাবে আল্লাহর রাসূলের খচ্চরটাকে তারা টেনে ধরলেন। তা না হলে রাসুল (সাঃ) একাই শত্রুদের মধ্যে ঢুকে যাবে। এই সময় আল্লাহ তা'আলা রাসুলের পাশে ফেরেস্তা নাযিল করে দিলেন।


এরপর রাসূল (সাঃ) তার চাচাকে বললেন আপনি ওদেরকে ডাক দেন। তখন আব্বাস (রাঃ) তাদেরকে ডাক দিলেন
, কোথায় হুদাইবিয়ার সন্ধির সাথীরা, কোথায় বদরের সাথীরা, কোথায় উহুদের সাথীরা, কোথায় খন্দকের সাথীরা, তোমরা কোথায় পালিয়েছ আল্লাহর রাসূল একা ময়দানে।


তাফসীরে বলা আছে গাভী যেরকম হাম্বা বলে ডাক দিলে, বাছুরগুলো দৌড় দিয়ে মায়ের কাছে আসে, ঐরকম ভাবে সমস্ত সাহাবীরা দৌড় দিয়ে সবাই মাঠে উপস্থিত হলো। এবং তারা দেখতে পেল যে মাঠে তো লোকের অভাব নেই মানে ফেরেশতা। এভাবে আবার মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে গেল।


আব্বাস (রাঃ) সম্পর্কে তাফসিরে বলা আছে
, উনার কণ্ঠস্বর ৮ মাইল পর্যন্ত যেত। এরপর মুসলমানেরা যুদ্ধ করে বিজয় লাভ করলেন এবং ছাকিব ও হাওয়াজিন গোত্র পরাজয় বরণ করলেন। তারা পরাজয় বরণ করার পরে প্রচুর ধনসম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল।


এই সম্পদগুলো তো আর বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে না
, সব ওখানে জমা ছিল। এই সম্পদ সম্পর্কে তারছিরা বলা আছে যে, ৬ হাজার নারী পুরুষ বন্দী হয়েছিল। ২০ হাজার উট মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল। ৪০ হাজার বকরি মুসলমানদের হস্তগতা হয়েছিল। এবং ৪ হাজার আউকিয়া মুদ্রা মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল।

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow