খন্দকের যুদ্ধ: মদিনা রক্ষার মহাকাব্য (পর্ব - ০১)

এই নিবন্ধে, আমরা খন্দকের যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ আলোচনা করব, যেখানে মুসলমানরা মক্কা ও তার মিত্রদের আক্রমণ থেকে মদিনা রক্ষা করার জন্য অসাধারণ সাহস ও কৌশল প্রদর্শন করে।

Apr 22, 2024 - 17:00
Apr 22, 2024 - 01:04
 0  18
খন্দকের যুদ্ধ: মদিনা রক্ষার মহাকাব্য (পর্ব - ০১)
খন্দকের যুদ্ধ: মদিনা রক্ষার মহাকাব্য (পর্ব - ০১) | প্রতীকী ছবি

খন্দকের যুদ্ধটা হলো কাফের মুশরিকদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের উপরে সর্বশেষ যুদ্ধ, সর্বশেষ আক্রমণ। এই যুদ্ধের পর আর কাফেরেরা কোনদিন মদিনার উপরে এগ্রেসিভ অ্যাটাক করতে পারেনি। এরপর মুসলমানেরাই অগ্রসর হয়েছে তারাই যুদ্ধ করেছে।


এই যুদ্ধের পরে হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হয়েছেএরপর মক্কা বিজয় হয়েছে। এরপর থেকে কাফেরেরা আর কোনদিন মদিনার উপরে আক্রমণ করতে সাহস করে নাই এটাই কাফেরদের শেষ যুদ্ধ। এই যুদ্ধটার বিস্তারিত বিবরণ সূরা আযহাবে আছে।


খন্দকের যুদ্ধের কারণ

বদরের যুদ্ধের কিছুদিন পরে আল্লাহর রাসূল ইয়াহুদী বনু কাইনুকাকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেন। উল্লেখ্য যে, মদিনায় তিন দল ইয়াহুদী বসবাস করতো, (১) ইয়াহুদি বনু কাইনুকা, (২) ইয়াহুদী বনু নজির এবং (৩) ইয়াহুদী বনু কুরাইজা।


এরা সকলেই পর্যায়ক্রমে মদিনা থেকে বহিষ্কার হয়েছে। সর্বপ্রথম বহিষ্কার হয়েছে ইয়াহুদী বনু কাইনুকা, এরপর বহিষ্কার হয়েছে ইয়াহুদী বনু নজির। সর্বশেষ বহিষ্কার হয়েছে ইয়াহুদী বনু কুরাইজা। আমরা যে খন্দকের যুদ্ধ আলোচনা করছি সেই সময় বনু কুরাইজা মদিনাতে অবস্থান করছে তারা এখনো বহিষ্কার হয়নি।


মদিনা থেকে দুইটি দল বহিষ্কার হয়েছে, ইয়াহুদি বনু কাইনুকা এবং ইয়াহুদী বনু নজির। এই ইয়াহুদীরা পরিষ্কার হয়ে কতক খাইবারে কতক সিরিয়ায় অবস্থান নিয়েছে। এই ইয়াহুদীরাই মূলত জঙ্গে আযহাবের সংগঠক ও আয়োজক। ইয়াহুদী বনু নজিরের সরদার হুয়াই বিন আত্তাব ও আবু রাফে এই ধরনের ইহুদী নেতা সহ ২০ জন ইহুদী নেতা মক্কায় মোশরেকদের কাছে উপস্থিত হয়।


এবং তারা মোশরেকদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করে, যে আমরা তোমাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করবো। তোমরা যদি মদিনা আক্রমণ কর, অর্থ দিয়ে অস্ত্র দিয়ে আমরা তোমাদের সাহায্য করবো এবং অল্প সময়ের মধ্যে মদিনা শহর, জয় করা সম্ভব হবে। মদিনা থেকে মুসলমানদেরকে এবং মোহাম্মদ (সাঃ) কে নির্মূল করা সম্ভব হবে। এই ব্যাপারে কুরাইশ এবং কেনানারা রাজি হয়ে গেল হ্যাঁ আমরা মদিনা আক্রমণ করব।


তাদেরকে রাজি করার পর হুয়াই বিন আত্তাব ও আবু রাফে ইহুদিদের ২০ জন আরো অন্যান্য লোকসহ তারা অন্য দলের কাছে চলে গেল। যেমন গোতফান, ফাজারা, আসজা, এই সমস্ত গোত্রের কাছে এরা চলে গেল। গোতফান অত্যন্ত শক্তিশালী জাতি ছিল, তাদের মধ্যে অনেক যুদ্ধা ছিল। এই গোতফান, ফাজারা, মাররা, আসজা এদের কাছে ২০ জন ইয়াহুদী নেতা গেল।


তাদেরকে বুঝালো যে, মক্কার কুরাইশ এবং মক্কার কেনানাদের যুদ্ধের জন্য রাজি করেছি, তোমরাও রাজি হও মদিনা আক্রমণ করবে আমরা তোমাদের যথা সাধ্য সাহায্য সহযোগিতা করব। এরপর তারাও রাজি হয়ে গেল। এভাবে কুরাইশ কেনানা গোতফান আসজা ফাজারা মাররা এরা মিলে দুই দলে, ১০-২০ হাজার সৈন্য প্রস্তুত করলো। এখন এরা মদিনা আক্রমণ করবে।


কুরাইশ ও কেনানা এদের সেনাপতি হলেন আবু সুফিয়ান। এবং গোতফান আসজা খাজারা এদের প্রধান সেনাপতি হল উইয়াব বিন্নে হারেস ফাজারী এবং হাজেস ইবনে আওফ। এরা সম্পূর্ণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে, মক্কা থেকে তারা মদিনার দিকে রওনা করলো। মক্কা থেকে মদিনা ৫০০ কিলোমিটার উত্তর দিকে অবস্থিত।


এখন স্বাভাবিকভাবে মনে হয়, মক্কা থেকে মদিনা আক্রমণ করলে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করা উচিত। কিন্তু মদিনার ভৌগোলিক অবস্থাটা এমন, যে মদিনা শহরে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করা সম্ভব নয়। মদিনা শহরের ভৌগোলিক অবস্থা এমন, মদিনা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ইয়াহুদি বনু নজির, ইয়াহুদি বনু কুরাইজা এদের দুর্গ। এবং এদের ঘন খেজুর বাগান।


এভাবে মদিনার দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলটা ইয়াহুদিদের দুর্গ এবং খেজুর বাগান দিয়ে ঘেরা। এদিক থেকে কোন মানুষ মদিনা শহরের প্রবেশ করতে পারে না। অন্তত যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রবেশ করতে পারে না। স্বাভাবিকভাবে বাড়ি ঘরে প্রবেশ করার জন্য ছোট ছোট গলি আছে। এজন্যই দক্ষিণ দিক থেকে মদিনা শহর আক্রমণ করা সম্ভব নয়।


মদিনা শহরের পূর্ব এবং পশ্চিম এই দুই দিকে লাহোর কঙ্কর ভূমি। কংকর ভূমি এতই মারাত্মক যে, ঐ কংকর ভূমিতে কোন মানুষ বা কোন উট বা পশু ঘোড়া প্রবেশ করলে, তাদের পা কেটে তারা জখম হয়ে যাবে, চলার শক্তি থাকবে না তারা অক্ষম হয়ে যাবে। এইজন্য মদিনার পূর্ব এবং পশ্চিম এই দুই দিক থেকে কোন মানুষ বা কোন সৈন্যদল মদিনা আক্রমণ করতে পারেনা।


শুধু উত্তর দিক। এই উত্তর দিক থেকে মদিনা শহরে সৈন্য প্রবেশ করতে পারে। এইজন্যই স্বাভাবিকভাবে আল্লাহর রাসূল যখন খবর পেলেন, মুশরেকরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করবে, তখন আল্লাহর রাসূল মদিনা শহর রক্ষা করার জন্য সাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন। পরামর্শের মধ্যে সালমান ফারসি রাঃ এই বছরই ইহুদিদের গোলামী থেকে মুক্তি পান।


আল্লাহর রাসূল যখন মদিনা শহর রক্ষার জন্য পরামর্শ করলেন, তখন সালমান ফারসি বললেন ইয়া রাসুল আল্লাহ আমরা যখন পারস্যে এভাবে আক্রান্ত হতাম, তখন আমরা পরিখা খনন করে, খন্দক খুড়ে আমরা শহরকে রক্ষা করতাম। কাজেই মদিনা শহরকে রক্ষা করার জন্য, সুন্দর পরামর্শ এটাই হবে যে মদিনা শহরের উত্তর দিক থেকে সৈন্যবাহিনী প্রবেশ করার মতো রাস্তা আমরা খন্দক খনন করে বা পরিখা খনন করে এ রাস্তা বন্ধ করে দিব।


সর্বসম্মতি ক্রমে সালমান ফারসির প্রস্তাবটা পাস হল। যে মদিনা শহরের উত্তর দিকে খন্দক খোড়া হবে। উহুদ পাহাড় উত্তরে রয়েছে এবং দক্ষিণ দিকে রয়েছে শিলা পর্বত। এই শিলা পর্বত কে পিছনে রেখে, উহুদ এবং শিলা দুই পাহাড়ের মাঝখানে মদিনার উত্তর দিক থেকে প্রায় তিন মাইল লম্বা পরিখা খনন করা হবে। এবং এটার গভীর হবে ১০ ফুট চওড়া হবে ২০ ফুট এবং প্রায় তিন মাইল লম্বা।


আল্লাহর রাসূল সাহাবায়ে কেরামদের জন্য রেখা টেনে দিলেন এবং প্রত্যেক ১০ জন সাহাবীর প্রতি, ৪০ হাত করে রাস্তা ভাগ করে দিলেন। এবং নকশা এঁকে দিলেন। মাটির উপরে তিনি রেখা টেনে দিলেন। যে তোমরা ১০ জন করে সাহাবী ৪০ হাত জায়গা খনন করবে। দশ হাত গভীর বিষা হাত চওড়া। ১০জনে চল্লিশ হাত। এভাবে সাহাবায়ে কেরামগণ খন্দক খোড়ার কাজ শুরু করলেন, আল্লাহর রাসূল নিজেও অংশ নিলেন।


খন্দক খোড়ার কাজ শুরু হওয়ার পর একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটলো। আমর ইবনে আওফ আনসার সাহাবী  তিনি বলেন, আমি সালমান ফারসি, হুযাইফা ইয়ামানি নোমান এবং অন্য ছয় জন আনসার মানে এরা কয়জন হল মুহাজির। আমরা দশজনে ৪০ হাত অংশ পেলাম। এরপর সমস্যাটা এই হল এরা খন্দক খোড়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে, এর মধ্যে একটা কঠিন পাথর বের হয়ে আসছে


সেই পাথরে আঘাত করলে তাদের লোহার অস্ত্র বাঁকা হয়ে যাচ্ছে ভেঙ্গে যাচ্ছে কিন্তু পাথর কাটছে না। এরকম একটা ভয়ংকর অবস্থা সৃষ্টি হলে, তখন তারা সালমান ফারসিকে বলল তুমি রাসুল (সাঃ) এর কাছে যাও গিয়ে বল ইয়া রাসুল আল্লাহ আপনি যে আমাদেরকে, রেখা টেনে চিহ্ন তো করে দিয়েছেন এই রেখা আমরা পরিবর্তন করতে চাই না।


কিন্তু আমাদের ভাগে এমন একটা কঠিন পাথর বের হয়ে আসছে সেই পাথরটাকে আমরা কোনভাবে ভাঙতে পারছি না। আমাদের লোহার অস্ত্র গুলো ফেরত আসতেছে ভেঙ্গে যাচ্ছে বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মাওলানা মোজাম্মেল হক হুজুরের তাফসির থেকে সংগৃহিত। আগামী পর্বে পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow