বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় ধ্বংস: হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর হত্যার প্রতিশোধ

বনী ইসরাঈল কেন দ্বিতীয়বার ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছিল? হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর হত্যার প্রতিশোধ কিভাবে নেওয়া হয়েছিল? এই আর্টিকেলটিতে, আমরা বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় ধ্বংসের কাহিনী তুলে ধরছি, যা তাদের নবী হত্যার ভয়াবহ পরিণতির একটি চিত্র তুলে ধরে।

Apr 23, 2024 - 09:00
Apr 22, 2024 - 23:36
 0  19
বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় ধ্বংস: হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর হত্যার প্রতিশোধ
বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় ধ্বংস: হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর হত্যার প্রতিশোধ

বনী ইসরাঈলদের প্রথম ধ্বংস হয়েছিল বকতে নসরের মাধ্যমে। বনী ইসরাঈদের প্রথম ধ্বংসের ৪৬১ বছর পর হযরত ইয়াহিয়া (আঃ)  জন্মগ্রহণ করেন। হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর পরের পয়গম্বর হচ্ছেন ঈসা (আঃ)। তো বকতে নসরের প্রথম ধ্বংসের ৪৬১ বছর পর, বনী ইসরাঈলদের দ্বিতীয় ধ্বংসের সূচনা হয়েছে। দ্বিতীয় ধ্বংসের প্রধান কারণ হলো, তারা হযরত জাকারিয়া (আঃ) কে হত্যা করেছে। এই নবীকে তারা করাত দিয়ে চিরে মেরেছে। এবং ঈসা (আঃ) এর মা মারিয়ম কে তারা বলেছে জেনাকারিনী মহিলা।


জাকারিয়া (আঃ) লালন পালন করেছে ঈসা (আঃ) এর মা মরিয়ম কে। মরিয়ম (আঃ) এর খালু জাকারিয়া (আঃ)। মরিয়ম (আঃ) এর পিতা ইমরান মারা যাওয়ার পরে, জাকারিয়া (আঃ) মরিয়মকে লালন পালন করেছেন সেখানে বড় হয়েছেন। এবং সেখানে বসেই তিনি ঈসা (আঃ) কে পেটে ধারন করেছেন। সন্তান প্রসবের ৪০ দিন পর যখন গৃহে ফিরে আসলেন


তখন বনী ইসরাঈলরা হযরত মরিয়ম ও জাকারিয়া (আঃ) কে অপবাদ দিতে লাগলেন, তখন ঈসা (আঃ)  মায়ের বুকের দুধ ছেড়ে দিয়ে তাদের দিকে তাকলেন। এবং বললেন,  قَالَ اِنِّیۡ عَبۡدُ اللّٰهِ ۟ؕ اٰتٰنِیَ الۡکِتٰبَ وَ جَعَلَنِیۡ نَبِیًّا
অর্থঃ সন্তান বললঃ আমি আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন। (সূরা মারইয়াম আয়াত-৩০)


তখন সবাই শান্ত হল, বুঝতে পারল যে মরিয়ম দোষী নয়। তারপরও বনী ইসরাঈলদের একটা দল হযরত জাকারিয়া (আঃ) কে দোষী সাব্যস্ত করল এবং তাকে হত্যা করল। জাকারিয়া (আঃ) এর সন্তান হলো ইয়াহিয়া (আঃ) সেই সময় বনী ইসরাঈদের যে বাদশা ছিল, সে চারিত্রিক দিক থেকে ভালো ছিল না। এই বাদশা সম্পর্কে তাফসীরে যেটা পাওয়া যায়, তার স্ত্রী বৃদ্ধ হয়ে গেছিল


কিন্তু সেই স্ত্রীর আগের স্বামীর একটা কুমারী মেয়ে ছিল। এরপর বাদশার স্ত্রী মনে করল, অবশ্যই আমার স্বামীতো এখন বিয়ে করবে। তো আমার আগের স্বামীর মেয়েকে যদি বিয়ে করে, তাহলে এই পরিবারে আমার ঠাই হবে। এখান থেকে বিতারিত হতে হবেনা। এই রকম একটা খারাপ পরিকল্পনা করে, ঐ মেয়েটাকে বাদশার সামনে ছেড়ে দেয়। পাতলা পোশাক পরে বাদশার সামনে খাবার দেয়া সরাপ সরবরাহ করা অসত উদ্দেশ্যে তারা এই পরিকল্পনা করে


এবং ঐ মেয়েকে তার মা শিখিয়ে দিয়েছে যে, বাদশা যদি তোমার প্রতি আকৃষ্ট হয় তুমি বাঁধা দিবেনা। এই রকম হতে হতে শেষ পর্যন্ত এই বাদশা এই নারীর ফাঁদে পরে গেল। এরপর বনী ইসরাঈলদের বাদশা ইয়াহিয়া (আঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার স্ত্রীর আগের স্বামীর মেয়ে, তাকে আমি বিয়ে করতে পারব কি না? তখন ইয়াহিয়া (আঃ) বললেন, এটা আপনার জন্য সম্পূর্ন হারাম। এর মা আপনার স্ত্রী, এই মেয়ে আপনার মেয়ে সমতুল্য এটা বিয়ে করা যাবেনা


এই কথাটা ঐ মেয়ের কানে চলে গেল। এরপর মেয়েটার দিকে যখন বাদশা আকৃষ্ট হলো, তখন মেয়েটা বলল, “আপনি যদি ইয়াহিয়া (আঃ) এর মাথা আমার সামনে উপস্থিত করতে পারেন, তাহলে আপনাকে বিয়ে করব, না হলে বিয়ে করব না বা সম্পর্কও করব না তখন বাদশা বলল যে এটা বাদে তুমি অন্য কিছু চাও, তুমি এটা চেয়েও না। তখন মেয়ে বলল না আমি অন্য কিছু মানবনা এটাই করতে হবে


শেষ পর্যন্ত বাদশা আদেশ করলেন, বাদশার আদেশে হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) কে হত্যা করা হল। হত্যা করার পর তার মস্তিষ্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সেই মস্তিষ্ক থেকে কথা বের হচ্ছে ঐ মেয়েটা তোমার জন্য হারাম। তোমার জন্য হারাম। তারা ইয়াহিয়া (আঃ) কে যেখানে হত্যা করেছে, সেই জায়গায় তাকে দাফন করছে কিন্তু কবর ভেদ করে রক্ত উপরে বের হয়ে আসতেছে। তখন তারা মাটি দিতে শুরু করল, মাটি যত দেয় ঐ মাটি ভেদ করে তার রক্ত উপরে ঠেলে উঠে


এবং টগবক করে ফোটে। এরকম হতে হতে রক্ত থামানোর জন্য, তারা চেষ্টা করে করে শহরের প্রাচীর পর্যন্ত উঁচু করে মাটি দিয়েছে তবুও রক্ত থামেনা টগবগ টগবগ করে ফুটছে। রাসূল সাঃ বললেন, কেউ যদি পয়গম্বর কে হত্যা করে এবং সেই পয়গম্বরের পক্ষ থেকে যদি যুদ্ধ করার জন্য মানুষ না থাকে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা ঐ পয়গম্বরের বিনিময়ে ঐ জাতি থেকে কমপক্ষে ৭০ হাজার লোক হত্যা করবেন


আর পয়গম্বরের কোনো খলিফা বা সাহাবীকে হত্যা করলে, কমপক্ষে ৩৫ হাজার লোক এর বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা ঐ জাতি থেকে হত্যা করবেন। হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর পক্ষ থেকে যুদ্ধ করার কেউ ছিলনা। এভাবে হযরত ইয়াহিয়া (আঃ)  কে ওরা হত্যা করল, তার রক্তকে ওরা গুম করতে পারলনা। শহরের প্রাচীরের কাছে যেখানে তাকে কবর দিয়েছিল, সেখানে রক্ত টগবগ করে ফুটছে


সমগ্র পৃথিবীর মানুষের মস্তিষ্ক আল্লাহর মুঠের মধ্যে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَ مَا مِنۡ دَآبَّۃٍ فِی الۡاَرۡضِ اِلَّا عَلَی اللّٰهِ رِزۡقُهَا وَ یَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّهَا وَ مُسۡتَوۡدَعَهَا ؕ کُلٌّ فِیۡ کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ অর্থঃ আর পৃথিবীতে কোন বিচরণশীল নেই, তবে সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন তিনি জানেন তারা কোথায় থাকে এবং কোথায় সমাপিত হয়। সবকিছুই এক সুবিন্যস্ত কিতাবে রয়েছে। (সূরা হুদ আয়াত-৬)


বনী ইসরাঈলদের দ্বিতীয় ধ্বংস যেভাবে হয়েছিল

সেই আমলের সিরিয়া অঞ্চলের এক দুর্দান্ত বাদশা ছিল তার নাম সাকারিব বা সাঞ্জারিব এই দুই নাম তাফসীরে পাওয়া যায়। এই বাদশা আল্লাহর হুকুমে এসে ঐ অঞ্চলটা ঘিরে ফেললেন। ঘিরে ফেলার পরে ওনার সেনাপতি বায়ুজাজান কে বললেন, “তুমি এই শহরে প্রবেশ করে এমন ভাবে রক্তপাত করবে যে, রক্তের ধারা আমার তাবুর সামনে চলে আসবে। আমি যখন দেখতে পাব রক্তের ধারা আমার তাবু পর্যন্ত চলে এসেছে, তখন তোমাকে বলন এখন হত্যা বন্দ করআর যদি রক্তের ধারা আমার তাবুর কাছে না আসে, তো তুমি সবাইকে হত্যা করে আমাকে খবর দিবে।” 


সেনাপতি বায়ুজাজান বনী ইসরাঈলদের যেখানে রাজধানী ছিল রাজবাড়ি ছিল দুর্গ ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস, সেখানে ঢুকে পড়ল। ঢোকার পর তিনি চিন্তা করতেছেন কোনদিক থেকে আক্রমণ করবে, খুজে খুজে তিনি উঁচু জায়গাটা বেছে নিলেন। কারণ এখান থেকে সবকিছু দেখা যাবে এরপর উঁচু পাঁচিরে উঠলেন, উঠে দেখলেন যে মনে হচ্ছে এখনি কাওকে জবাহ করা হয়েছে রক্তটা বকবক করে ফুটছে। উনি অবাক হয়ে গেলেন এখানে তো জবাহ করার কোন চিহ্ন নেই, একটা জবাহ করলে তো কয়েক মিনিটের মধ্যেই রক্তটা জমাট বেঁধে যায়। 


কি ব্যাপার? তখন উনি ঐ শহরের ৭০০ গুণী জ্ঞানী লোক ধরে নিয়ে আসলেন। তাদের জিজ্ঞেস করলেন তোমরা সত্য কথা বলো, যে রক্তটা কেন এখানে টগবগ করে ফুটছে? তখন ওরা উত্তর দিল, ৮০ বছর পর্যন্ত আমরা এই জায়গাটায় কুরবানী করে আসছি, কিন্তু একটা কুরবানী আমাদের কবুল হয় নাই, সেই কুরবানীর এই রক্ত এরকম টকবক করে ফুটছে।” তখন বায়ুজাজান বলল ঠিক আছে এই রক্তটা যদি ঠান্ডা না হয়, তোমাদের সবার রক্ত এটার উপর ঢেলে দিব দেখি ঠান্ডা হয় কি না। এরপর ৭০০ জ্ঞানী গণী লোককে ওই রক্তের উপরে জবাহ করা হলো


তারপরও রক্ত থামছেনা, সবার রক্ত জমাট বাঁধে গড়িয়ে যায় কিন্তু ইয়াহিয়া (আঃ) এর রক্ত থামছেনা টকবক করে ফুটছে। তারপর সে আবার ৭৭০ জন লোক ধরে নিয়ে আসল তারা সবাই যুবক, তাদেরকে বলা হল তোমার সত্য কথা বলো এখানে রক্তটা কেন ফুটছে? তখন যুবকরা ঐ একই কথা বলল যে ৮০ বছর ধরে কুরবানী করছি একটা কুরবানী কবুল হয়নি। উনি বললেন আমি বিশ্বাস করবোনা তোমাদের রক্ত দ্বারা এই রক্ত ঠান্ডা করব


এদের সবাইকে ঐ রক্তের উপর জবাহ করলেন। কিছুই হলোনা তবুও রক্ত ফুটছে। এরপরে তাফসীরে বলা আছে বনী ইসরাইলদের ঐ শহর থেকে ৭ হাজার লোক ধরে নিয়ে আসলেন এবং তাদের স্ত্রীদের সহ সবাই বয়স্ক। এরপর তাদেরকে ঐ প্রশ্ন করেছে, তখন তারা ঐ একই উত্তর দিয়েছে যে আমরা ৮০ বছর ধরে কুরবানী করছি একটা কুরবানী কবুল হয়নি। তারপর ঐ ৭ হাজার লোক সবাইকে ঐ রক্তের উপর জবাহ করেছে


এরপর শহরের বাকী লোকদের ধরে নিয়ে এসে সেনাপতি বায়ুজাজান জিজ্ঞেস করলেন, আমার বাদশার আদেশ তোমাদের আমি এমন ভাবে হত্যা করব যে, তোমাদের রক্ত যদি বাদশার তাবু পর্যন্ত প্রবাহিত না হয়, তোমাদের এমন ভাবে হত্যা করবো যে এই শহরে আলো জ্বালাবার মত কোন লোক থাকবে না। তোমরা সত্য কথা বলো, আসলে এখানে কি হয়েছে?


তখন ওরা বলল সত্য কথা হচ্ছে এই, এখানে আমরা একজন আল্লাহর নবীকে হত্যা করেছি। এবং বনীকে হত্যা করার কারনে, এই রক্তটা কোন ভাবেই থামাতে পারছি না।” তখন সেনাপতি বিশ্বাস করলেন যে এবার তোমরা সত্য কথা বলেছ। এরপর সেনাপতি বায়ুজাজান সব সৈন্যদের বললেন তোমরা প্রাচীরের বাহিরে চলে যাও, এরপর তিনি সিজদায় পরে গেলেন


তখন ওনি বনী ইসরাঈলদের বললেন দেখো আমি বুঝতে পারছি আল্লাহ আমাদের দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। তোমরা একজন অসহায় পয়গম্বর কে হত্যা করেছ, এই প্রতিশোধের জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদের দ্বারা এই কাজ করিয়েছেন। এখন তোমাদেরকে আমি পরামর্শ দিচ্ছি যে, তোমার আমার বাদশার তাবুর দিকে একটা ড্রেন করে দাও, আর তেমাদের পশুগুলো জবাহ করো আর পশুর লাশগুলো নিচে রেছে মানুষের লাশ উপর দাও


এইভাবে যদি রক্ত বাদশার তাবু পর্যন্ত যায়, তাহলে বাদশা আমাকে হত্যা করার আদেশ প্রত্যাহার করবেন। ওরা তাই করল। রক্ত যখন বাদশার তাবু পর্যন্ত গেল, তখন বাদশা হত্যা বন্দ করতে বলল। এই ভাবে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর হত্যার প্রতিশোধ নেন।
মাওলানা মোজাম্মেল হক সাহেবের তাফসীর থেকে সংগ্রহীত

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow