মৃতের জন্য খাওয়ানো: কোরআন কি বলে?

এই আর্টিকেলটি মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাওয়ার ব্যাপারে কোরআনের নির্দেশিকাগুল বর্ণনা করে। আল্লাহ তায়ালার বাণী "وَ اِذَا حَضَرَ الۡقِسۡمَۃَ اُولُوا الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰکِیۡنُ فَارۡزُقُوۡهُمۡ مِّنۡهُ وَ قُوۡلُوۡا لَهُمۡ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا" (সুরা: ৪, আয়াত: ৮) এর ভিত্তিতে আলোচনা করা হয়েছে যে, মৃত ব্যক্তির আত্মীয়, এতিম ও গরিবদের খাওয়ানো একটি উত্তম কাজ।

Apr 23, 2024 - 11:00
Apr 22, 2024 - 23:58
 0  16
মৃতের জন্য খাওয়ানো: কোরআন কি বলে?
মৃতের জন্য খাওয়ানো: কোরআন কি বলে?

মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাওয়া নিয়ে কোরআন কি বলে 

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 وَ اِذَا حَضَرَ الۡقِسۡمَۃَ اُولُوا الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰکِیۡنُ فَارۡزُقُوۡهُمۡ مِّنۡهُ وَ قُوۡلُوۡا لَهُمۡ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا

অর্থঃ সম্পত্তি বন্টনের সময় যখন আত্মীয়-স্বজন এতিম ও মিসকিন উপস্থিত হয়, তখন তা থেকে তাদের কিছু খাওয়াইয়ে দাও এবং তাদের সাথে কিছু সদলাপ করো। (সূরা নিসা আয়াত-৮)

ব্যাখ্যাঃ যখন সম্পদ বন্টন করার সময় আসে, নিকটতম আত্মীয়-স্বজন ও এতিম মিসকিন যারা উপস্থিত হয়, তোমরা ওই সম্পদ বন্টন করার পূর্বে ওখান থেকে তাদেরকে খাওয়াইয়া দাও। এবং তাদের সাথে তোমরা ভালো ব্যবহার কর। এই আয়াত সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, ইমাম শাফি, নাকি, জহুর এরা বলেন এই আয়াতটা মোহকাম স্পষ্ট। এবং ইমাম মুজাহিদ বলেন, মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের প্রতি এ আয়াতের হুকুম পালন করা ওয়াজিব


অর্থাৎ এক ব্যক্তি মারা গেলে, তার সম্পত্তি বন্টন করার আগেই উপস্থিত যারা এয়াতিম মিসকিন আত্মীয়-স্বজন ও বংশধর তাদেরকে খাওয়ায়ে দিতে বলা হয়েছে। আর ওয়ারিশরা যদি নাবালক হয় তাহলে তার অভিভাবকরা বলবেন যে, নাবালকদের সম্পত্তি ব্যয় করার অধিকার আমাদের নেই। তারা বড় হয়ে গেলে আপনাদেরকে খাওয়াবে। আবার কোন কোন তাফসির কারক বলেছেন অভিভাবকদের দায়িত্ব নিয়ে নাবালকদের সম্পত্তির থেকেও খাওয়াইয়া দিতে হবে


মোহাম্মাদ ইনবে শিরিন একটা ঘটনা বর্ণনা করেন, ওবাইদা সালমানি এতিমদের সম্পত্তি বন্টন করলেন। বন্টন করার সময় তিনি ওই এতিমের একটা বকরি জবাই করে, সবাইকে খাওয়াইয়া দিলেন। এবং তিনি বললেন আল্লাহর আয়াত বলছে যে মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে খাওয়াও, এজন্য এই এতিমদের বকরি জবাই করে সবাইকে খাওয়ার ব্যবস্থা করলাম। মহান আল্লাহ যদি এটা না বলতেন, তাহলে আমার নিজের বকরি জবাই করে সবাইকে খাওয়াইতে পারতাম। সেজন্য আমি ওদের বকরি জবাই করলাম আল্লাহর হুকুম পালন করার জন্য


এই আয়াতটা নিয়ে দেখে যায়, অনেক লোক বলে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে খাওয়া বেদাত। এটাতো সরাসরি কোরআনের আয়াত এখানে তো অস্পষ্ট কিছু নেই, তাহলে বেদাত হবে কেন? এ আয়াতের মধ্যে বোঝা যায় না এমন কিছু তো নেই। এইজন্য বিষয়টা হলো, একটা মানুষ ইন্তেকাল করলে তার আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী যারা আছেন এই লোকটার জন্য সবাই কিছু না কিছু তার সেবা করে। অসুস্থ থাকলে তাকে দেখাশোনা করা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, মারা যাওয়ার পর তার জানাজায় শরিক হওয়া, তার জন্য কবর খোরা এই রকম বিভিন্ন ধরনের কাজ পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনরা করে থাকে


এখন ওই লোকটা মারা যাওয়ার পর তার সম্পত্তি আত্মীয়রায় নিয়ে যাবে। কিন্তু এই লোকগুলো যে এত পরিশ্রম করল, লাশ ধোয়ালো, কবর খনন করলো, জানাযায় শরিক হলো, তার জন্য দোয়া করলো এই জন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন সম্পত্তি পাবে কয়েকটা লোকে, কিন্ত তার সেবা করেছে অনেক লোকে, কাজেই এই সমস্ত লোকদের তোমরা সম্পত্তি দিতে পারবেনা, এইজন্য সবাইকে এক বেলা খাওয়াইয়া দাও। এবং তাদের কাছে ক্ষমা চাও, যে আপনারা অনেক কষ্ট করেছেন আপনাদের আমরা কিছু দিতে পারি নাই, এই জন্য আপনাদের জন্য স্বাভাবিক সেবা যত্ন আমরা করলাম


এটাই সুন্নাত প্রাচীন কাল থেকে এটা চলে আসছে। অনেকে বলেন সাহাবীরা এগুলো করেননি আমরা করবো কেন? অবশ্যই সাহাবারা করেছেন মোহাম্মাদ ইবনে শিরিন, ওবাইদা সালমানি, ইমাম মুজাহিদ তিনি তাবিই এনাদের কথাই তো বলা হলো। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস তিনি তো বিখ্যাত সাহাবি, উনারাই তো এ কথাগুলো বলেছেন। এটা তো এমন না আমরা বলছি যে খাওয়াও, এটা আমাদের বলার কোন একতিয়ার নাই, কুরআনে যেটা আছে তাফসীরে যেটা আছে সেটাই আমরা বলব


সেই জন্য এই বিষয়টা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করাই ভালো। এই সমস্ত বিষয়গুলো নিয়ে আপনারা একটু গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করুন। এইগুলো যারা নিষেধ করে তারা মনে হয় মুসলমানদের বিপক্ষে কাজ করে। কি ভাবে? যেমন একটা গ্রামের একটা লোক মারা গেল, সেই ওসিলায় গ্রামবাসী যদি একত্রিত হয়ে সবাই মিলে ঐ বাড়িতে খানা খায়, এ কারণে গ্রামবাসীর মধ্যে একটা ঐক্যমত সৃষ্টি হয়। কারো সাথে মনোমালিন্য থাকলে, বিভেদ থাকলে সেটাও কিন্তু মানুষেরা এই সময় মিটিয়ে নেয়


মনে করেন গ্রামে কারো সাথে কারো মনোমালিন্য আছে, তখন একটা লোক মনে করে আহারে আমার মা-বাবার জন্য যে জিয়াফতের আয়োজন করলাম উমুকে আসবেনা, তখন তার কাছে যেয়ে মাপ চেয়ে নেয়, যে ভাই আমাকে মাফ করে দেন আমার বাবা মারা গেছে আপনি আমাকে মাফ করে দেন, আমিও আপনাকে মাফ করে দিলাম। চলেন আমার বাবার জিয়াফতে আপনি আসেন, আমার সাথে খানা খান। এভাবে কিন্তু মানুষের ছোটখাটো মনোমালিন্য দূর হতে পারে। এবং এর ফলে মানুষের মধ্যে একটা ভাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টি হতে পারে


এখন মনে করেন একটা গ্রামে যদি এরকম পাঁচটা লোক মারা যায়, এবং পাঁচবার যদি গ্রামবাসী এক জায়গায় একত্রিত হয়, এর মধ্য দিয়েই কিন্তু তাদের মধ্যে একটা সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়। আর এটা যদি না করা হয়, কারো সাথে কোন খবর নাই, আত্মীয়তার হকের কথা কুরআন পাকে আল্লাহ তা'আলা কঠিন ভাবে বলেছেন। নিকটতম আত্মীয়, নিকটতম প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, পাঁজরের সাথী যারা একসঙ্গে ওঠাবসা করে। এদের হক আদায় করতে কোরআনে অন্য আয়াতে আদেশও করেছেন


তাহলে আপনারা এটা কিভাবে আদায় করবেন? একটা লোক মারা গেলে এই উসিলায় অন্তত গ্রামের মানুষগুলো প্রতিবেশীদের আপনি একত্রিত না করেন, তাহলে এই এহসানটা কিভাবে করবেন বলেন?

আল্লাহ তায়ালা বলেন,  وَ اعۡبُدُوا اللّٰهَ وَ لَا تُشۡرِکُوۡا بِهٖ شَیۡئًا وَّ بِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا وَّ بِذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰکِیۡنِ وَ الۡجَارِ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡجَارِ الۡجُنُبِ وَ الصَّاحِبِ بِالۡجَنۡۢبِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ وَ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ مَنۡ کَانَ مُخۡتَالًا فَخُوۡرَا অর্থঃ তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর, তার সাথে অপর কাউকে শরিক করিও না। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয় এতিম মিসকিন প্রতিবেশী অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। (সূরা নিসা আয়াত-৩৬)


এই যে ৯ টা গ্রুপ এহসান করতে পারে, এহসান করার তো এগুলোই সুযোগ। যে আপনার বাবা মারা গেছেন এই সময় সবাইকে দাওয়াত করে, একবেলা খাওয়ায় দিলেন এটাই তো এহসান। এহসান কিভাবে মানুষকে করা যায়? কয়টা মানুষকে টাকা পয়সা বা বড় বড় হাদিয়া দেওয়া যায়? কাজেই এই সব বিষয়গুলো হলো মুসলমানদের জন্য সামাজিক বন্ধন। এই খানাদানা এই বন্ধন বন্ধ করে দিলে, মনে হবে যেন কেউ কাউকে চেনে না। এতে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হবে যে কেউ কাউকে চেনে না হিংস্র পরিবারের মত


কারো সাথে কারো যোগাযোগ নাই এরকম হয়ে যাবে। আর এইরকম মৃত ব্যক্তির অনুষ্ঠান যদি বছরে ২-৪-৫ বার হয়, আত্মীয় স্বজনের সাথে পরিচিতি হয়, অচেনাকে চেনা হয়, যারা আসে না, তারা আসে এটার বিরাট একটা উপকার আছে সামাজিক উপকার


কাজেই এই কাজটাকে যারা নিষেধ করে, আমার মনে হয়েছে তারা ইসলামের কোন শত্রুদের সাথে তারা জোট করে তারা মুসলমানদের যে একটা সামাজিক বন্ধন এটাকে তারা দুর্বল করার জন্যই এই ধরনের কথা তারা বলে। এইটা যে বেদাত, এইটা বলার  কোন কিছুই আমি দেখিনা। আমি বিভিন্ন তাফসীর খুঁজে দেখেছি। মাওলানা মোজাম্মেল হক সাহেবের তাফরিস থেকে সংগ্রহীত।

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow