আখিরাত ও তার প্রমাণ: সূরা আন-নাবার আলোচনা

সূরা আন-নাবা, যার অর্থ ‘খবর’ বা ‘সংবাদ’, মাক্কায় অবতীর্ণ হওয়া ৭৮ নম্বর সূরা। এই সূরায় আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত ও আখিরাত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং মু’মিনদেরকে নেক আমলের মাধ্যমে আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

Apr 23, 2024 - 12:00
Apr 23, 2024 - 00:10
 0  20
আখিরাত ও তার প্রমাণ: সূরা আন-নাবার আলোচনা
আখিরাত ও তার প্রমাণ: সূরা আন-নাবার আলোচনা

সূরা আন-নাবা এর তাফসির

নাম: সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতের নাবা শব্দ থেকেই নাম রাখা হয়েছে। নাবা অর্থ খবর বা সংবাদ। এ থেকেই নবী শব্দ তৈরি হয়েছে, যার অর্থ সংবাদবাহক বা পয়গামবার। এ সূরায় বড়-খবর বা মহা-সংবাদ দ্বারা কিয়ামাত ও আখিরাত বুঝানো হয়েছে

নাযিলের সময়: মাক্কী যুগের প্রথম ভাগে সূরাটি নাযিল হয়। এর আগের তিনটি সূরা- কিয়ামাহ, দাহর ও মুরসালাত এবং এর পরের নাযিয়াতের সাথে এই সূরাটির আলোচ্য বিষয়ে বেশ মিল আছে এবং পাঁচটি সূরাই মাক্কী যুগের প্রথমভাগে নাযিল হয়েছে

আলোচ্য বিষয়: কিয়ামাত ও আখিরাতই এর আলোচ্য বিষয়। আখিরাতের প্রমাণ এবং আখিরাতকে মানা ও না মানার ফলাফল সম্পর্কে মানুষকে এখানে সাবধান করা হয়েছে

নাযিলের পরিবেশ: রাসূল (সা.) যখন ইসলামের তাবলীগ শুরু করেন, তখন তিনটি কথাকে পয়লা কবুল করার জন্য জনগণকে দাওয়াত দেন- তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত


. আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ ও মাবুদ মানা এবং আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলীতে আর কাউকে শরীক না করাই তাওহীদের মূলকথা

. মুহাম্মাদ (সা.)-কে আল্লাহর রাসূল হিসাবে মানাই রিসালাতের পয়লা কথা

. এ কথা বিশ্বাস করা যে, এ দুনিয়া এক সময় খতম হয়ে যাবে এবং আর একটা জগত পয়দা হবে, যখন সব মানুষকে আবার জীবিত করা হবে এবং তাদের আকীদা-বিশ্বাস ও আমলের হিসাব নেয়া হবে


শেষ বিচারে যারা মু'মিন ও সৎকর্মশীল প্রমাণিত হবে, তাদেরকে চিরদিনের জন্য বেহেশতে পাঠানো হবে। আর যারা কাফির, ফাসিক ও মুনাফিক প্রমাণিত হবে, তাদেরকে দোযখে দেয়া হবে। এটাই হলো আখিরাতের সংক্ষেপ কথা এ তিনটি কথার মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় কথার চেয়ে তৃতীয় কথাটিকে মেনে নেয়াই মাক্কাবাসীরা বেশী কঠিন মনে করলো। 


আল্লাহকে তারা বিশ্বাস করতো, কিন্তু একমাত্র আল্লাহকেই ইলাহ, মাবুদ ও মনিব মানতে হবে এবং আর কারোই ইবাদত করা যাবে না-একথা তারা মানতে রাযী ছিল না তেমনিভাবে মুহাম্মাদ (সা:) কে তারা নবুওয়াতের আগেই সবচেয়ে সত্যবাদী, সচ্চরিত্র ও আমানতদার বলে স্বীকার করতো। কিন্তু আল্লাহর রাসূল হিসাবে তাঁকে স্বীকার করতে রাযী ছিল না। তাই আল্লাহ তাআলা ও মুহাম্মাদ (সা:) তাদের কাছে অপরিচিত ছিল না


কিন্তু কিয়ামাত ও আখিরাতের কথা তাদের কাছে একেবারেই আজব মনে হলো। তারা কিছুতেই এ কথাকে সত্য বলে মানতে পারছিল না। এটাকে তারা অসম্ভব ও অবাস্তব মনে করতো। তাই এ কথাটি নিয়ে তারা খুব ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে লাগলো, এটাকে যুক্তি, বুদ্ধি ও বিশ্বাসের অযোগ্য মনে করলো এবং এটাকে কল্পনারও অতীত মনে করে চরম বিস্ময় প্রকাশ করলো


অথচ ইসলামের পথে জনগণকে আনতে হলে আখিরাতের বিশ্বাস তাদের দিলে না বসিয়ে উপায় ছিল না। কারণ, আখিরাতের আকীদা মন-মগয়ে মযবুত না হলে মানুষ কিছুতেই ইসলাম অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারে না


আখিরাতের বিশ্বাস ছাড়া হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝবার যোগ্যতাই সৃষ্টি হয় না এবং ভাল ও মন্দের ব্যাপারে সঠিক মূল্যবোধ মোটেই পয়দা হয় না। রূপ-রস-গন্ধে ভরা এ দুনিয়ার মজা মানুষকে এত জোরে টেনে নেয় যে, আখিরাতের প্রতি মযবুত ঈমান ছাড়া তা থেকে ছুটে আসা কিছুতেই সম্ভব নয় এ জন্যেই মাক্কী যুগের প্রথম ভাগে নাযিল হওয়া সূরাগুলোতে আখিরাতের আকীদা মন-মগযে মযবুত করার জন্য এত জোর দেয়া হয়েছে। 


অবশ্য আখিরাতের যুক্তি-প্রমাণ এমনভাবে পেশ করা হয়েছে, যাতে তাওহীদের ধারণা আপনা-আপনিই মগযে বসে যায়। ফাকে ফাকে রাসূল (সা:) ও কুরআনের সত্যতার প্রমাণও তাতে এসে গেছে। এ থেকেই বুঝা যায়, মাক্কী যুগের প্রথম ভাগের সূরাগুলোতে আখিরাত সম্বন্ধে বারবার এত আলোচনা কেন করা হয়েছে

 

আলোচনার ধারা

. ১-৩ পয়লা তিন আয়াতে আখিরাত সম্বন্ধে মাক্কাবাসীরা যে তর্কবিতর্ক ও হাসি-ঠাট্টা করছিল এবং নানা রকম মতামত ও মন্তব্য প্রকাশ করছিল, সেদিকে ইশারা করেই সূরাটি শুরু করা হয়েছে

 

. ৪ ও ৫ আয়াতে একটু ধমকের সুরে বলা হয়েছে, আখিরাতকে তোমরা স্বীকার করছো না ? একটু অপেক্ষা কর। শিগগিরই জানতে পারবে। মওত বেশী দূরে নয়। মওতের পরই সব জানতে পারবে

 

. ৬-১৬ আয়াতে আখিরাত অবিশ্বাসীদের মন-মগযে খোঁচা দিয়ে তাদেরকে কতক প্রশ্ন করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা করতে বাধ্য হয়। আল্লাহ পাক দুনিয়ার জীবনে মানুষের সুখ-সুবিধার জন্য যা কিছু পয়দা করেছেন, সে সবের উল্লেখ করে বলেন, যমীন ও আসমান, দিন ও রাত, পাহাড় ও নদী, স্বামী ও স্ত্রী, ঘুম ও বিশ্রাম, সূর্য ও বৃষ্টি এবং তার সৃষ্ট বাগ-বাগিচা উৎপন্ন খাদ্যদ্রব্য সুবন্দোবস্ত কি আমি করি নি।


মরণের পরপারে তোমাদের জীবনে যা-কিছু হবে, তার ব্যবস্থাও আমি করেছি। এ জীবনে আমি যা করেছি, তা তোমরা দেখতে পাচ্ছ। পরকালে কি করব, তা এখন দেখতে পাচ্ছ না বলেই কি তা অস্বীকার করা যুক্তি ও সুবুদ্ধির লক্ষণ ? তোমাদের জন্য দুনিয়ায় যত সুখ-সুবিধার ব্যবস্থা করেছি, আর কোন সৃষ্টির জন্য তা করিনি। বরং গোটা সৃষ্টিজগত তোমাদের খিদমতের জন্যই পয়দা করেছি।


কোন্ যুক্তিতে তোমরা এই ধারণা করছ যে
, দুনিয়ার পরপারে তোমাদের কাছে কোন হিসাব চাওয়া হবে না? দুনিয়ায় তোমরা আমার মরযী মতো চলেছ কি-না একথা কি জিজ্ঞেস করা হবে না? তোমরা কি মনে কর দুনিয়ার এ সব কিছু আমি খেল-তামাশার জন্য সৃষ্টি করেছি? এর পেছনে কোন বড় উদ্দেশ্যই কি নেই ? তোমাদেরকে দুনিয়ায় এত ক্ষমতা দিলাম এবং ভাল-মন্দ বুঝবার শক্তিও দিলাম। এরপর এসব কিভাবে ব্যবহার করলে এটুকুর হিসাব না নিয়ে এমনিই তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে?


. ১৭ ও ১৮ আয়াতে খুব জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তোমাদের এ জীবনের ফলাফল কি হবে, সে বিষয়ে ফায়সালা করার দিন ঠিক হয়েই আছে। শুধু শিংগায় একটা ফুঁক দিতে যা দেরী। তখন তোমরা সবাই দলে দলে হিসাব দেবার জন্য হাশরের ময়দানে হাযির হয়ে যাবে। আজ সে কথা বিশ্বাস কর আর না-ই কর, তাতে আল্লাহর কিছুই আসে যায় না


. ১৯ ও ২০ আয়াতে কিয়ামাতের অবস্থার সামান্য ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে


. ২১-৩০ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা আখিরাতের হিসাব-কিতাবের ধার ধারে নি, তাদের সব কীর্তিকলাপ গুনে গুনে রেকর্ড করেছি এবং তাদের খিদমাত করার জন্য দোযখ ওঁত পেতে আছে। সেখানে তাদের সব আমলের পুরাপুরি বদলা দেয়া হবে


. ৩১-৩৬ আয়াতে ঐসব লোকের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, যারা আখিরাতের হিসাব-নিকাশের খেয়াল রেখে পুরো দায়িত্ববোধ নিয়ে দুনিয়ায় জীবন যাপন করেছে তাদেরকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে যে, তাদের নেক আমলের পুরস্কার ছাড়াও অতিরিক্ত অনেক নিয়ামাত দান করা হবে


. ৩৭-৩৮ আয়াতে আদালতে আখিরাতের ছবি তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, সেখানে কারো পক্ষে তার অনুগামীদের পার করিয়ে নেবার তো প্রশ্নই ওঠে না, বিনা অনুমতিতে মুখ খোলার ক্ষমতাও কারো হবে না। কথা বলার অনুমতি যারা পাবে, তারা নিজেদের মরযী মতো যা-ইচ্ছা তা-ই বলতে পারবে না। সুপারিশ করার অনুমতি যিনি পাবেন, তিনিও নিজের ইচ্ছামতো যার-তার জন্য সুপারিশ করতে পারবেন না। যার জন্য সুপারিশের অনুমতি হবে, শুধু তারই পক্ষে কথা বলতে পারবেন


. শেষ দু'আয়াতে চূড়ান্ত ধমক দিয়ে বলা হয়েছে যে, শেষ যে দিনটির কথা জানানো হলো, তা মোটেই দূরে নয়। এখন যার ইচ্ছা হয় আল্লাহর পথে চলুকযারা এরপরও আখিরাত বিশ্বাস করতে চায় না, তাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছি যে, তোমরা যা-কিছু করছ, সবই সেদিন তোমাদের সামনে হাযির করা হবে। তখন শুধু আফসোস ও অনুতাপ করে বলতে হবে যেহায়! আমি যদি পয়দাই না হতাম, বা এখন যদি মাটিতে মিশে যেতে পারতাম এবং শাস্তি থেকে কোন রকমে রেহাই পেয়ে যেতাম। কিন্তু এ আফসোস শুধু দুঃখই বাড়াবে এতে কোন লাভ হবে না


বিশেষ শিক্ষা

এ সূরায় দোযখ ও বেহেশতের যে ছবি পাশাপাশি আঁকা হয়েছে, তাতে দেখান হয়েছে যে, দোযখ এমন এক চিরস্থায়ী বাসস্থান, যেখানে দুঃখের কোন সীমা নেই, আর বেহেশতে সুখেরও কোন সীমা নেইযা মানুষের দরকার তার অভাবের কারণেই দুঃখ বোধ হয়। দেহে পানির অভাব হলেই পিপাসা হয়। স্বাস্থ্যের অভাবে যে দুঃখ হয়, তারই নাম অসুখ বা সুখের অভাব


এ সূরার ২১ থেকে ২৬ আয়াতে দোযখ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, সেখানে যখন পিপাসা বোধ হবে, তখন অবশ্যই পানি দেয়া হবে। কিন্তু সে পানি অভাব দূর করবে না, বরং এমন পানি দেয়া হবে, যাতে পিপাসা লক্ষ-কোটি গুণ বেড়ে যাবে। এতে পানির অভাববোধ বেড়ে গিয়ে দুঃখ বাড়তেই থাকবে।


কিন্তু বেহেশতের অবস্থা এর বিপরীত হবে। সেখানে অভাবের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। সুখ ও আরামের জন্য মানুষ যা চায় সবই সেখানে অফুরন্ত পাবে দুনিয়াতে সুখ ও দুঃখ এক সাথে মিলে আছে।দুঃখ বিনা সুখ লাভহয় না। কিন্তু আখিরাতে দুঃখ ও সুখ একেবারেই আলাদা হয়ে যাবে। দোযখে শুধু দুঃখ এবং বেহেশতে শুধু সুখ থাকবে। এ দুটো আর এক সাথে পাওয়া যাবে না


বেহেশতে শুধু একটি জিনিসেরই অভাব থাকবে যার নাম অভাব এবং যা দুঃখের কারণ। বেহেশত এমন এক বাসস্থান, যেখানে সকল প্রকার অভাবেরই অভাব রয়েছে। আর দোযখে একমাত্র ঐ জিনিসই আছে, যা বেহেশতে নেই। তারই নাম অভাব। অভাব ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow