বরছিছা দরবেশ: কীভাবে একজন ভালো মানুষ পাপের পথে হাঁটলেন

বরছিছা দরবেশ একটি মিথিলা গল্পের চরিত্র, যে প্রায় ৩৬ বছর ধরে আল্লাহর ইবাদত করছে। সবাই তাকে ভক্তি এবং শ্রদ্ধা করে। বরছিছা একটি গির্জা তৈরি করে এবং তার গির্জায় থাকে। একদিন শয়তান তার মন্ত্রিপরিষদ ডাকলেন এবং বললেন, বরছিছা দরবেশকে বিপথগামী করার জন্য, আমি যাকে পাঠায় সবাই ফিরে আসে।

Apr 23, 2024 - 13:00
Apr 23, 2024 - 00:25
 0  18
বরছিছা দরবেশ: কীভাবে একজন ভালো মানুষ পাপের পথে হাঁটলেন
বরছিছা দরবেশ: কীভাবে একজন ভালো মানুষ পাপের পথে হাঁটলেন

বনী ইসরাঈলের এক দরবেশ ছিল তার নাম হলো বরছিছা। এই বরছিছা দরবেশ একটা গির্জা তৈরি করে, ৩৬ বছর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত করছে। এবং সে খুব ভালো মানুষ সবাই তাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে। ঐ বরছিছা দরবেশ তার গির্জায় থাকত। শয়তান একদিন তার মন্ত্রিপরিষদ ডাকছে। ডেকে বলে, বরছিছা দরবেশকে বিপথগামী করার জন্য, আমি যাকে পাঠায় সবাই ফিরে আসে। বরছিছার কোন ক্ষতি করতে পারেনি।


শয়তান তার কর্মীদের, কর্ম ভাগ করে দিয়ে সিংহাসনে বসে থাকেন। এই বরছিছাকে বিপদগামী করার জন্য যাকে পাঠানো হয়, তারা এসে রিপোর্ট করে আমরা বরছিছা দরবেশর কোন ক্ষতি করতে পারিনি। তখন শয়তান চিন্তা করল কি করা যায়, এরপর ইবলিশ শয়তান আবিয়াস গ্রুপের এক শয়তান ডাকলেন।


যে শয়তানগুলো নবী-রাসূলদের কে ওয়াসওয়াসা দেয় সেই শয়তানদেরকে আবিয়াস গ্রুপের শয়তান বলা হয়। তখন আবিয়াস গ্রুপের ঐ শয়তান বলল আমাকে দায়িত্ব দেন আমি এই কাজ সম্পন্ন করতে পারব। ইবলিশ শয়তান বললো ঠিক আছে তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া হল। তখন আবিয়াস গ্রুপের ওই শয়তান খ্রিস্টানদের পাদ্রীর বেশ ধরলেন।


মাঝখান থেকে মাথা কামাইয়া তাদের যে ধর্মীয় পোশাক  আছে সেই ধর্মীয় পোশাক পরে, ওই গির্জার সামনে গিয়ে বরছিছা দরবেশকে সালাম দিলেন দিয়ে বললেন ভাই আপনার সাথে আমার একটু কথা আছে। কিন্তু বরছিছা তার ডাকে সাড়া দিল না। সাড়া না দেওয়াই ওই শয়তান গির্জার বারান্দায় নামাজ পড়া শুরু করে দিলেন। এমন ভাবে নামাজ পড়া শুরু করলেন যে ঘুমায়ো না ক্লান্তও হয় না। এরপর বরছিছা দরবেশ এ অবস্থা ৪০ দিন দেখার পরে, তার অন্তরে একটা পরিবর্তন আসলো। যে লোকটা এত বড় সাধক, এ লোকটা আমার কাছে কিছু বলতে চাইছিল আমি সাড়া দিলাম না।


এরপর বরছিছা দরবেশ জিজ্ঞেস করলেন ভাই আপনি আমার কাছে কি চাচ্ছেন বলেন। তখন শয়তান বলল আমার আর কি চাওয়ার আছে, পৃথিবীতে আপনার মত এরকম অনেক ভালো ভালো লোকের সাথে আমার সম্পর্ক আছে। মাঝে মাঝে এদের সাথে আমি সাক্ষাকার এর জন্য আসি। আপনার সাথেও আমি সাক্ষাৎ করব কথা বলব ইবাদত বিনিময় করব।


আপনার থেকে আমি শিখব আপনি আমাকে শিখাবেন। এইজন্য আপনার অপেক্ষা করছি। এভাবে খুব অনুনয় বিনয় করার পরে, বরছিছা তাকে অনুমতি দিলেন ঠিক আছে আপনি আমার গির্জায় অবস্থান করেন, ইবাদত করেন। এভাবে চলতে থাকলো কিছুদিন। তারপর দেখা গেল বরছিছার চাইতে শয়তান বেশি ইবাদত করে। বরছিছা দরবেশ তার সাথে ইবাদত করতে পারে না। বরছিছা একজন মানুষ তার ঘুম আসে ক্লান্তি আসে। কিন্তু শয়তানের ঘুম নাই ক্লান্তি নাই সে নামাজ পড়ে রোজা রাখে। বরছিছা দরবেশ এগুলো দেখে তার মনটা দুর্বল হয়ে গেল, যে আমার চাইতেও সাধনা করার লোক পৃথিবীতে আছে।


এভাবে আস্তে আস্তে তার মনটা দুর্বল করে ফেলল। এরপর শয়তান মনে মনে ভাবল আমি যখন তার মনকে জয় করতে পারছি, তখন শয়তান বরছিছাকে বলে, আপনার মত আরও এমন সঙ্গী সাথী পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আছে। তাদের সাথে আমার দেখা করার দরকার আপনার সাথে আর সময় দিতে পারছি না। আমি এখন চলে যাব। আপনার ব্যাপারে আমার যে একটা ধারণা ছিল, আমি মনে করেছিলাম আপনি অনেক পাকাপোক্ত হয়েছেন, কিন্তু আপনার ভিতরে এখনো অনেক দুর্বলতা রয়েছে।


আপনি কিন্তু সেরকম এখনো পাকাপোক্ত হতে পারেন নাই। এ ধরনের কথা বলে বরছিছা দরবেশকে আরো দুর্বল করছে। এখন বরছিছা চায় যে উনি যেন আমার কাছ থেকে না যায়। বরছিছা বললেন আপনি থাকেন, শয়তান বলল, না আমি থাকবো না আমার অনেক সঙ্গীর সাথে আপনার মত আছে, তাদের সাথে আমার আলাপ-আলোচনা আছে আমি থাকবা না। আমি চলে যাব তবে আমি যাওয়ার আগে আপনাকে কিছু জিনিস দিয়ে যাব। যদি আপনি কিছু না বলেন, তবে আপনার খুব উপকার হবে। বরছিছা রাজি হয়ে গেলেন।


কিছু যাদুবিদ্যা শিখে দিয়ে গেল, এবং বলল আপনি যেকোনো রোগীকে ফুঁক দিবেন ভালো হয়ে যাবে। এটা বলে শয়তান ওখান থেকে চলে গেল, চলে যাওয়ার পর ওই অঞ্চলের একজন মানুষের ভিতর ঢুকে চোখ দুটো বন্ধ করে দিল। কবিরাজ এর কাছে যাবার পরে কবিরাজ বলে তার চোখের কোন ত্রুটি দেখতে পাচ্ছি না। এভাবে আর একটা লোকের গলা বন্ধ করে দিল কথা বলতে পারেনা। এ লোকটাকেও কবিরাজ দেখে বলল তার কোন সমস্যা নেই।


এরপর ওই শয়তান কবিরাজির বেশ ধরে বের হয়েছে, এটার চিকিৎসা আমি করতে পারব। তখন সে দেখে শুনে বলল আমিতো পারছি না তবে আমি একজনকে চিনি তার কাছে গেলে ভালো হয়ে যাবেন। তখন রোগীর আত্মীয়রা বলল সে কে, তখন শয়তান বলল বরছিছা দরবেশ। এরপর ওই রোগীরা আত্মীয়-স্বজন বরছিছার কাছে গিয়ে বললো একজন কবিরাজ আপনার এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর বরছিছা ফুঁক দিল সাথে সাথে ভালো হয়ে গেল। এইভাবে বরছিছা সুনাম সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পরল।


এইভাবে রোগী বাড়তে লাগলো আর বরছিছার ইবাদতে বিঘ্ন ঘটে গেল। ওই শয়তান কখন কারো ভিতরে ঢুকে কারো পেট ব্যথা কারো গলা ব্যথা এরকম বিভিন্ন কর্ম করে ওই রোগীদের বরছিছা দরবেশর কাছে পাঠিয়ে দেয়। এরপর ওই শয়তান একটা রাজকুমারীর ভিতরে ঢুকলো। ডুকে রাজকুমারীকে পাগলী করে দিল। কোন ডাক্তার কবিরাজ তাকে ভালো করতে পারে না। তখন ওই শয়তান কবিরাজি ব্যাগ নিয়ে রাজপ্রাসাদে ঢুকলো।


এবং বলল আমার দ্বারা এই চিকিৎসা করা সম্ভব না আপনি বরছিছার কাছে নিয়ে যান। এরপর রাজা তার কন্যাকে নিয়ে বরছিছার সেখানে যায়, এখন বরছিছা চিন্তা করলো আমি একজন মহিলার চিকিৎসা করব? আমাকে এর থেকে মুক্তি দেন আমি এই চিকিৎসা করব না। তখন ওই শয়তান রাজাকে বুদ্ধি দিল আপনি এই গির্জার পাশে একটা ঘর করে আপনার মেয়েকে রেখে দেন, আপনার মেয়ের যখন কষ্ট হবে এটা বরছিছার চোখে পড়লে সে কষ্ট পাবে এবং তারপর হয়তো চিকিৎসা করবে।


ওইভাবে কাজ হল রাজকন্যাকে ওখানে রেখে গেল। এরপর বরছিছা যখন নামাজে দাঁড়ায়, নামাজ পড়তে লাগে ঠিক ওই সময় শয়তান এসে ওই রাজকুমারীর মধ্যে ঢুকে। এবং তার মধ্যে নানা রকম জ্বালা যন্ত্রণা শুরু করে দেয়। মেয়েটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে, এরপর বরছিছা চিন্তা করলো আমি মেয়েটার ঝাড়ফুক করি সে খুব কষ্ট পাচ্ছে। তারপর সে ঝাড়ফুক করলো। ঝাড়ফুক করলে ভাল হয়ে যায়।


কিন্তু উনি যখন আবারো নামাজে দাঁড়ায় তখন শয়তান ওই মেয়েকে অসুস্থ করে দেয়। এভাবে তার নামাজের বিঘ্ন ঘটায়। এভাবে যেতে যেতে অবস্থাটা এই দাঁড়ালো যে, বরছিছা যখন ওই মেয়েটার কাছে যায়, তখন ওই মেয়েটা আপনা আপনি কাপড় চোপড় সব খুলে ফেলে। দেখেন শয়তানের চালটা কি দেখেন। এইভাবে হতে হতে, যেহেতু সে একটা কুমারী মেয়ে আর বরছিছা একজন পুরুষ। মানসিক দুর্বলতা সবারই আছে। তখন শয়তান বরছিছাকে ওয়াসওয়াসা দেয় তুমি এই মহিলাকে ব্যবহার কর।


আল্লাহ ক্ষমাশীল তোমাকে ক্ষমা করে দিবে। শেষ পর্যন্ত ওই রাজকুমারীর সাথে বরছিছা জিনায় লিপ্ত হলো। এবং এভাবে হতে হতে সে রাজকুমারীটা গর্ভবতী হলো। এখন তার গর্ব যখন প্রকাশ পেয়ে গেল, তখন বরছিছা চিন্তিত হয়ে গেল এখন আমি কি করবো। ওই শয়তান আবার দরবেশর বেসে আসলো এসে বলে, তুমি এত বড় একটা বেয়াদবি কাজ করলে? এটা কেন করলে?


তখন বরছিছা বলল হুজুর আমার ভুল হয়ে গেছে এখন আমি কি করবো
? তখন ওই দরবেশ বেসে শয়তান বুদ্ধি দিল, মেয়েটাকে হত্যা করে পাহাড়ের ঐ পাশে পুতে রাখো। যদি ওর ভাই বাবার আসে তখন বলবে, ওই শয়তান আমাকে নিয়ে গেছে। তো বরছিছা এই বুদ্ধিটা খুব পছন্দ হলো, এরপর রাতের আঁধারে ওই রাজকুমারীকে হত্যা করে পাহাড়ের কিনারায় পুতে রাখল।


কিন্তু শয়তান আরেকটু কাপড় বের করে রাখছে। যাতে ওটা সে প্রমাণ করতে পারে। এরপর রাজকুমারীর রাত্রে সজন আসলে, বরছিছা বলে তাকে যে শয়তান আছর করেছে সেই শয়তান খুব শক্তিশালী তাকে হয়তো তুলে নিয়ে চলে গেছে। তখন তারা চলে গেল রাতের বেলায় ওই মেয়ের বড় ভাইকে শয়তান স্বপ্ন দেখালো, বরছিছা তার সাথে জিনাই লিপ্ত হয়েছে তাকে গর্ভবতী করেছে এবং হত্যা করে পাহাড়ের কিনারায় পুতে রেখেছে।


কিন্তু উনি বিশ্বাস করেন না। এভাবে তিনদিন তাকে স্বপ্নে দেখানো হলো তারপরও সে বিশ্বাস করল না। এরপর মেজ ভাইকে একই স্বপ্ন শয়তান দেখালো। সেও তিন দিন এই একই স্বপ্ন দেখলো কিন্তু বিশ্বাস করলো না। ছোট ভাইকে এভাবে তিন দিন স্বপ্নে দেখালো। এরপর একদিন ছোট ভাই বড় ভাইকে জিজ্ঞেস করল আমি এরকম স্বপ্ন তিন দিন দেখেছি। তখন বড় ভাই বলল আমিও দেখেছি। এরপর মেজো ভাই বলল আমিও দেখেছি। এরপর ওই কবিরাজ বেশ শয়তান এসে বলে তোমার বোনকে কোথায় হত্যা করে পুতে রেখেছে এটা আমি জানি আমার সাথে চলো দেখাইয়া দিচ্ছি। এরপর তারা সেখান থেকে তার বোনের লাশ তুলল।


তারপর বরছিছা মেরে পিটে তার গির্জা ভেঙ্গে দিয়ে বিচারের জন্য নিয়ে গেল। বরছিছা প্রথমে বিচারকের সামনে অস্বীকার করেছে আমি এ বিষয়ে কিছু জানিনা। তখন ওই শয়তান দরবেশ বেসে এসে বলল, তুমি একটা খুন করছো আবার মিথ্যা কথা বলতেছ? পাপের উপর পাপ তুমি তো শেষ হয়ে যাবে। তুমি সব কিছু স্বীকার করো। এরপর বরছিছা মনে করছে তার জ্ঞান নেই, স্বীকার করল তারপর তাকে শুলেবৃদ্ধ করা হবে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।


তখন ওই শয়তান বরছিছাকে বলল তুমি বনি ইসরাঈলদের গির্জা ধ্বংস করেছো এখন তোমার ব্যাপারে কি করা যায় বলো? তোমাকে একটা শেষ পরামর্শ দিবো যদি আমার কথা শোনো, আমি এমন কাজ করবো ওরা তোমাকে ফাঁসি দিতে পারবে না। আমি সবাইকে অন্ধ করে ফেলব। অন্ধকারে তোমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাব।


তখন বরছিছা বলল কি করতে হবে? ওই দরবেশে শয়তান বলল একটা কাজ করতে হবে, আমাকে একটা সেজদা করতে হবে। তখন বরছিছা বলল আমার হাত পা যে বাধা সেজদা করব কিভাবে? দরবেশ বেশে শয়তান বলল, সেজদার নিয়তে মাথায় একটু নিচু করলেই হবে। তখন বরছিছা নিজের মুক্তির জন্য, মাথা নত করে ইশারায় তার সেজদা করলো। এরপর শয়তান বলল আমার কাজ শেষ। আমি গেলাম। এরপর বরছিছার ফাঁসি হয়ে গেল।


সূরা হাশরের ১৬ নং আয়াতের তাফসিরে এই ঘটনাটি উল্লেখিত আছে।



আল্লাহ তাআলা বলেন,

کَمَثَلِ الشَّیۡطٰنِ اِذۡ قَالَ لِلۡاِنۡسَانِ اکۡفُرۡ ۚ فَلَمَّا کَفَرَ قَالَ اِنِّیۡ بَرِیۡٓءٌ مِّنۡکَ اِنِّیۡۤ اَخَافُ اللّٰهَ رَبَّ الۡعٰلَمِیۡنَ


অর্থঃ তাদের তুলনা হচ্ছে শয়তান, যখন সে মানুষকে বলে, কুফরী কর। অতঃপর যখন সে কুফরী করে তখন শাইতান বলেঃ তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি জগতসমূহের রাব্ব আল্লাহকে ভয় করি। [সূরা হাশর, আয়াত-১৬]

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow