কিয়ামত ও আখিরাতের ভয়াবহতা: সূরা আন-নাযিয়াতের আলোকে

সূরা আন-নাযিয়াত কিয়ামত, পুনরুত্থান, হিসাব ও পরকালের বর্ণনা তুলে ধরে। মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও আল্লাহর বিচারে বিশ্বাস স্থাপন করা সূরার মূল উদ্দেশ্য। সূরায় মুসা (আ:) ও ফিরআউনের ঘটনার উল্লেখ করে আল্লাহকে অস্বীকার করার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। আখিরাতে বিশ্বাস না করার অযৌক্তিকতা প্রমাণ করে সূরাটি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ জীবনের মাধ্যমে পরকালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানায়। সহজ ভাষা, দৃষ্টান্ত ও উপমার মাধ্যমে সূরাটি পাঠককে পরকাল সম্পর্কে সচেতন করে তোলে এবং সৎ জীবনযাপনের জন্য অনুপ্রাণিত করে। এই সূরাটি মুসলিমদের ঈমান ও কর্মের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে।

Apr 23, 2024 - 14:00
Apr 23, 2024 - 00:41
 0  19
কিয়ামত ও আখিরাতের ভয়াবহতা: সূরা আন-নাযিয়াতের আলোকে
কিয়ামত ও আখিরাতের ভয়াবহতা: সূরা আন-নাযিয়াতের আলোকে

নামঃ সূরার প্রথম শব্দ নাযি'আতঅনুযায়ী এ সূরার নামকরণ করা হয়েছে। নাযিলের সময় : সূরা নাবার পর এ সূরা নাযিল হয়। এর আলোচ্য বিষয় থেকে বুঝা যায় যে, মাক্কী যুগের প্রথম যুগের প্রথম ভাগেই সূরাটি নাযিল হয়েছে

 

আলোচ্য বিষয়ঃ এর মূল বিষয় আখিরাত। কিয়ামাত ও মরণের পর আবার জীবিত হবার প্রমাণ এবং আল্লাহ ও রাসূলকে অস্বীকার করার কুফল এ সূরায় আলোচনা করা হয়েছে। নাযিলের পরিবেশ সূরা নাবার সমসাময়িক সূরা হিসাবে এর নাযিলের পরিবেশও সূরা নাবারই অনুরূপ


আলোচনার ধারা

. ১-৫ আয়াতে আল্লাহ পাক ঐসব ফেরেশতার কসম খেয়েছেন, যারা মৃত্যুর সময় জান বের করে নেয়, আল্লাহর হুকুম পাওয়ার সাথে সাথে তা পালন করে ও আল্লাহর কথামত গোটা সৃষ্টি জগতের সমস্ত ব্যবস্থাপনা করে থাকে। কিয়ামাত যে হবেই হবে এবং মৃত্যুর পর যে আবার জীবিত হতেই হবে। সে বিষয়ে পূর্ণ নিশ্চয়তা দানের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তাআলা ঐ ফেরেশতাদের কসম খেয়ে বুঝাতে চাচ্ছেন যে, ফেরেশতারা আজ জান বের করে নেবার যোগ্য হয়ে থাকলে তারা আল্লাহর হুকুমে জান ফিরিয়ে দেবারও শক্তি রাখে। যে ফেরেশতারা আল্লাহর হুকুম পালনে তৎপর, তারা আজ যেমন সমস্ত সৃষ্টি জগতকে চালাচ্ছে, তেমনি একদিন এ জগতকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেবে এবং আবার আর একটি জগত সৃষ্টি করতে পারবে


. ৬-১৪ আয়াতে বলা হয়েছে যে, আজ তোমরা কোন্ যুক্তিতে কিয়ামাতকে অসম্ভব মনে করছ ? এর জন্য তো একটা বড় রকমের ভূমিকম্পই যথেষ্ট। আর একটা ঝাঁকুনি দিলেই আর এক দুনিয়ায় তোমরা সব হাযির হয়ে যাবে। আজ যারা সে কথাকে সত্য মনে করছে না, তারাই সেদিন ভয়ে কাঁপতে থাকবে এবং ভয়াতুর দৃষ্টি মেলে তারা ঐসব কিছু দেখতে থাকবে, যা আজ তারা অসম্ভব বলে ধারণা করছে


. ১৫-২৬ আয়াতে মূসা (আ:) ও ফিরআউনের কাহিনী অতি সংক্ষেপে উল্লেখ করে কিয়ামাতে অবিশ্বাসীদেরকে সাবধান করে বলা হয়েছে যে, রাসূলকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা, তাঁর দেখানো পথে চলতে অস্বীকার করা এবং চালাকী ও চালবাজি করে তাঁকে পরাজিত করার অপচেষ্টা চালাবার যে কি কুফল, তা ফিরআউন দেখতে পেয়েছে। এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে যদি তোমরা ফিরআউনের মতো আচরণ ত্যাগ না কর, তাহলে তোমাদেরকেও ফিরআউনের মতোই দুঃখজনক পরিণাম ভোগ করতে হবে


. ২৭-৩৩ আয়াতে আখিরাত ও পরকালের যুক্তি-প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। প্রথমেই অবিশ্বাসীদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছে, “তোমাদেরকে আবার পয়দা করা বেশী কঠিন কাজ, না চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারায় সজ্জিত এ বিরাট জগত তৈরি করা ?” এ ছোট্ট একটা প্রশ্নের মাধ্যমে আখিরাত হওয়া যে খুবই সম্ভব, সে বিষয়ে মযবুত যুক্তি পেশ করা হয়েছে


এরপর মানুষ ও তার পালিত পশুর দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু জরুরী, তা পয়দা করার উদ্দেশ্যে আসমান ও যমীনে যে বিরাট সুব্যবস্থা রয়েছে, আল্লাহ পাক সেদিকে কাফিরদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। দিন ও রাত, সমতল যমীন ও উঁচু পাহাড়, আকাশের বৃষ্টি ও যমীনের ঝরণা এবং এসবের কারণে মানুষ ও পশুর জন্য যত কিছু উৎপন্ন হয় এর প্রতিটি জিনিস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে কোনটাই বিনা উদ্দেশ্যে অনর্থক তৈরি করা হয়নি


এটুকু ইঙ্গিত দিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করা হয়েছে যে, মানুষকে এমন একটা উদ্দেশ্যপূর্ণ জগতে কি বিনা উদ্দেশ্যে পয়দা করা হয়েছে ? এ প্রশ্নের জওয়াব তালাশ করার দায়িত্ব মানুষের উপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। মানুষের বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞান কি এ কথাই বলে যে, দুনিয়ায় মানুষকে ভাল ও মন্দ বাছাই করার যোগ্যতা দিয়ে এবং আসমান ও যমীনের সব কিছুকে ব্যবহার করার ক্ষমতা দিয়ে এমনিই ছেড়ে দেয়া হয়েছে ? মরার পর এ সবের কোন হিসাব নেয়া হবে না


. ৩৪-৪১ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যখন আখিরাত হবে, তখন মানুষের সেখানকার চিরস্থায়ী জীবনের ভাগ্য এ দ্বারা নির্ধারিত হবে যে, দুনিয়ার জীবনটা সে কিভাবে কাটিয়েছে। আল্লাহর অবাধ্য হয়ে দুনিয়ার মজা ভোগ করাকে যারা জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছিল। দোযখই তাদের স্থায়ী ঠিকানা হবে। আর যারা আখিরাতে মনিবের সামনে হাযির হয়ে হিসাব দেবার ভয় করেছে এবং সে অনুযায়ী তাদের নাফসের মন্দ ইচ্ছাকে দমন করেছে, জান্নাতই হবে তাদের স্থায়ী বাসস্থান


এ কথা দ্বারা উপরের ঐ প্রশ্নের জওয়াব দেয়া হলো যে, মানুষকে দুনিয়ার জীবনে যে ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এর স্বাভাবিক, নৈতিক যুক্তিগত দাবী এটাই যে, আখিরাতে মানুষের পার্থিব জীবনের হিসাব নেয়া এবং এর ভিত্তিতেই তাদের পুরস্কার ও শাস্তি হওয়া উচিত


. ৪২-৪৪ আয়াতে কিয়ামাত কবে হবে? কাফিরদের এ প্রশ্নের জওয়াব দেয়া হয়েছে। অবিশ্বাসীরা ঠাট্টা করার উদ্দেশ্যে বারবার রাসূল (সা:)-কে প্রশ্ন করতো যে, “কিয়ামাতের এত ভয় দেখাচ্ছ কেন? এখনি কিয়ামাত এনে দেখাও না কেন? এটা যদি সত্যই হবে, তাহলে কবে আসবে তাই অন্তত বলে দাও না কেনএ কটি আয়াতে এসব প্রশ্নেরই সুন্দর জওয়াব দেয়া হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছে, কিয়ামাতের দিন-তারিখ জানাবার কোন দায়িত্ব রাসূলকে দেয়া হয় নি। একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো তা জানা নেই। কিয়ামাত যে অবশ্যই হবে এ বিষয়ে শুধু সাবধান করাই রাসূলের দায়িত্ব


. ৪৫-৪৬ আয়াতে বলা হয়েছে যে, রাসূল (সা:) কিয়ামাত ও আখিরাত সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক ও সজাগ করে দিয়েছেন। কিন্তু মানুষকে জোর করে আখিরাতে বিশ্বাস করাবার দায়িত্ব রাসূলকে দেয়া হয় নি। এরপর যার ইচ্ছা হয় বিশ্বাস করুক এবং পরকালের হিসাবের ভয় করে নিজের জীবনকে সংশোধন করুক


অবশ্য যখন সত্যিই হিসাবের দিন এসে যাবে, তখন এ অবিশ্বাসীরাই ভালভাবে অনুভব করবে যে, চিরস্থায়ী জীবনের কথা ভুলে দুনিয়ার সামান্য সময়ের জীবনকে নিয়ে মত্ত হয়ে থাকাটা কত বড় বোকামি হয়েছে। আখিরাতের স্থায়ী জীবনের সাথে তুলনা করে তারা নিজেরাই তখন বুঝতে পারবে যে, পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবনটা বা কবরে থাকার সময়টা সামান্য একটা সকাল বা বিকালের চেয়ে বেশী লম্বা ছিল না

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow