আখিরাতের ভয়াবহতা: নিকটতম মানুষও হবে দূরে

সূরা নাবা মাক্কার প্রাথমিক যুগে নাযিল হয়েছিল। এতে রিসালাত ও আখিরাত বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। রাসূল (সাঃ)-কে দাওয়াতের সঠিক নীতি শেখানো হয়েছে এবং যারা দ্বীন কবুল করবে না তাদের আখিরাতের পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে। সূরার মূল বিষয় হল রিসালাত ও আখিরাত। রাসূল (সাঃ)-কে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে তিনি যেন হেদায়াত চায় তাদের জন্য সময় ও শ্রম খরচ করেন, কিন্তু হঠকারী ও অহংকারী নেতাদের হেদায়াত করার চেষ্টা না করেন। তিনি সকলকে কুরআনের উপদেশ দিতে পারেন, কিন্তু তা গ্রহণ করা বা না করা তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। কাফিরদের আচরণ নিন্দা করা হয়েছে এবং তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে আল্লাহ তাদেরকে ন্যায় বিচার করবেন। সূরার শেষভাগে আখিরাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হাশরের ময়দানে সকলের অবস্থা একরকম হবে না। মুমিনরা জান্নাতে যাবে, আর কাফিররা জাহান্নামে যাবে। এই সূরা থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে রিসালাত ও আখিরাত বিশ্বাস করা আমাদের কর্তব্য। আমাদের সকলের উচিত রাসূল (সাঃ)-এর আদর্শ অনুসরণ করা এবং আখিরাতের জন্য আমল করা।

Apr 23, 2024 - 15:00
Apr 23, 2024 - 00:53
 0  16
আখিরাতের ভয়াবহতা: নিকটতম মানুষও হবে দূরে
আখিরাতের ভয়াবহতা: নিকটতম মানুষও হবে দূরে

নাম: সূরার প্রথম শব্দটিই এর নামের ভিত্তি

নাযিলের সময়: সূরার শুরুতেই যে ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, সে সম্পর্কে ইতিহাস ও হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এ সূরাটি মাক্কী যুগের প্রাথমিক অবস্থায় নাযিলকৃত সূরাগুলোর অন্যতম


আলোচ্য বিষয়
: এ সূরার মূল আলোচ্য বিষয় রিসালাত ও আখিরাত। এখানে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করার ব্যাপারে রাসূল (সা: ) কে সঠিক নীতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং যারা দ্বীন কবুল করতে রাযী নয় আখিরাতে তাদের কি দশা হবে তা বলা হয়েছে


নাযিলের পরিবেশ: নবুওয়াতের দায়িত্ব পাওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যেক নবী ও রাসূল সমাজের নেতাদের দ্বীন কবুল করার দাওয়াত দিয়েছেন। প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী লোকেরা যা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষ তা সহজেই কবুল করে বলেই তারা নেতৃস্থানীয় লোকদের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তাই বিশ্বনবী (সা:) মাক্কার নেতা ও গণ্যমান্য লোকদের ইসলাম কবুল করবার জন্য বুঝাচ্ছিলেন


একদিন রাসূল (সা:) ওতবা, শায়বা, আবু জাহল, উবাই-বিন-খালফ, উমাইয়া-বিন-খালফের মতো ইসলামের চরম বিরোধী নেতাদের যখন ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, তখন ইবনে উম্মে মাকতুম নামে রাসূল (সা:)-এর এক অন্ধ আত্মীয়, সেখানে হাযির হয়ে কিছু প্রশ্ন করতে চাইলেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই তিনি বিরক্ত হলেন


অবশ্য রাসূল (সা:)-এর বিরক্তির অর্থ এটা নয় যে, তিনি বড়লোকদের গুরুত্ব বেশী দিতেন বা সাধারণ লোককে অবহেলা করতেন। তিনি অত্যন্ত আশা নিয়ে মাক্কার বড় বড় নেতাদের হিদায়াত করার চেষ্টা করছিলেন। ঐ সময় অন্য কেউ এসে কথা বললে বিরক্ত হওয়া দূষণীয় নয়। একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ব্যস্ত থাকা অবস্থায় কোন লোক এসে অন্য কথা বলতে শুরু করলে বিরক্ত হবারই কথা


আল্লাহ তাআলা এ উপলক্ষে যে কথা সূরার পহেলা দশটি আয়াতে বলেছেন, “তাতে পাঠক মনে করতে পারেন যে, এখানে রাসূল (সা:)-কে ধমক দেয়া হয়েছে। আসলে পরোক্ষভাবে এখানে ঐ কাফের সর্দারদের বিরুদ্ধেই আল্লাহ পাক রাগ প্রকাশ করেছেন।” তিনি বলতে চাচ্ছেন যে, যে সর্দাররা ইসলামের দুশমন-এরা হিদায়াত চায় না আপনি এদেরকে এত দরদ দিয়ে বুঝাচ্ছেন অথচ এরা আপনাকে মানতে মোটেই রাজি নয়। যারা আপনার কাছে হিদায়াতের উদ্দেশ্যে আসে, তারা সাধারণ লোক হলেও আল্লাহর কাছে তাদের দামই বেশী। অবিশ্বাসী নেতাদের কোন মূল্য নেইইবনে উম্মে মাকতুম অন্ধ এক সাধারণ মানুষ হলেও তিনি হিদায়াতের আগ্রহ নিয়ে আসায় আল্লাহর কাছে তার মূল্য অনেক বেশী


আলোচনার ধারা

. ১-১০ আয়াতে যা বলা হয়েছে, তা উপরের আলোচনায় এসে গেছে। এখানে আল্লাহ পাক রাসূলকে পরোক্ষভাবে উপদেশ দিচ্ছেন যে, হিদায়াত পেতে যারা চায়, তাদের জন্য আপনি সময় ও শ্রম খরচ করুন। যে সব নেতা অহংকারী, হঠকারী ও হকের দুশমন, তাদের হিদায়াত করার ক্ষমতা আপনাকে দেয়া হয় নি। ছোট ও বড়, নেতা ও সাধারণ লোক সবাইকেই দাওয়াত দিতে থাকুন। কিন্তু এ জাতীয় নেতাদের তোষামোদ করার দরকার নেই। তাদের যদি দ্বীনের প্রতি আগ্রহ না থাকে, তাহলে তাদের জন্যও দ্বীনের কোন প্রয়োজন নেই


. ১১-১৬ আয়াতে রাসূল (সা:)-কে বলা হয়েছে, “আপনি যে কুরআন পেশ করছেন, তা সবার জন্য অবশ্যই মূল্যবান উপদেশ। আল্লাহ স্বয়ং ফেরেশতাদের পবিত্র হাতে এ কিতাব লিখিয়ে রেখেছেন, যা অতি সম্মানিত ও পবিত্র। এ উপদেশ যত মহামূল্যবানই হোক, যাকে ইচ্ছা তাকেই এ উপদেশ কবুল করতে বাধ্য করার কোন দায়িত্ব বা ক্ষমতা আপনাকে দেয়া হয় নি। আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, যার ইচ্ছা হয় সে কবুল করে উচ্চ মর্যাদা লাভ করুক, আর যার ইচ্ছা আগ্রহ্য করে লানতের ভাগী হোক।”


. ১৭-২০ আয়াতে আল্লাহ পাক কাফিরদের আচরণকে নিন্দা করে বলেছেন যে, যারা কুরআনের মতো উপদেশকে কবুল করতে অস্বীকার করে, তারা আসলে নিজেদেরই ধ্বংস করে। তারা কি একটু চিন্তা করে না যে, আল্লাহ পাক সামান্য বীর্যের পানি দিয়ে তৈরি করে তাদের মধ্যে এতসব গুণ ও যোগ্যতা সৃষ্টি করেছেন? তারপর তাদের ভাল ও মন্দ পথ চিনবার ক্ষমতা দিয়ে যে পথ ইচ্ছা সে পথই কবুল করা সহজ করে দিয়েছেন। তিনি কোন এক পথে চলার জন্য বাধ্য করেন নি। ইচ্ছার এ স্বাধীনতাটুকু দিয়েছেন বলেই কি আল্লাহর অবাধ্য হওয়া উচিত ? যে অবাধ্য হলো, সে প্রকৃতপক্ষে নিজকে ধ্বংসই করলো


. ২১-২৩ আয়াতে বলা হয়েছে যে, “দুনিয়ার জীবনে মানুষকে ইচ্ছা ও চেষ্টার ক্ষেত্রে যেটুকু স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, তা মৃত্যুর সাথে সাথেই খতম হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা তাকে মৃত্যুর পর কবরে থাকতে বাধ্য করবেন, আবার যখন সময় হবে তাকে জীবিত করবেন।” এ ব্যাপারে মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন দাম নেই। মরতে অস্বীকার করা, কবরে পড়ে থাকতে রাজি না হওয়া বা আবার জীবিত হতে আপত্তি করার কোন ক্ষমতাই তার থাকবে না এমন অসহায় মানুষ কোন সাহসে আল্লাহর হুকুম পালন করে না? যে আল্লাহর হাতে তার হায়াত, মওত ও পুনরুত্থান, সে আল্লাহর হুকুমকে অমান্য করে ধ্বংস হওয়া ছাড়া আর কি লাভ হতে পারে।”


. ২৪-৩২ আয়াতে ঐ কথাই বলা হয়েছে, যা সূরা নাবার ৬-১৬ আয়াতে ও সূরা নাযিয়াতের ২৭-৩৩ আয়াতে বলা হয়েছে। এখানে মানুষের চিন্তাশক্তির প্রতি আপীল করা হয়েছে এবং বিবেককে জাগাবার মতো আবেগপূর্ণ কথা বলা হয়েছেদুনিয়ার জীবনে মানুষের যতরকম খাদ্য ও পানীয় দরকার, তার কতকগুলো উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, মানুষ একটু খেয়াল করে দেখুক, যে মনিব এতসব নিয়ামাতের ব্যবস্থা করেছেন, তার অবাধ্য হওয়া কি বিবেক বিরোধী নয় ? যিনি এসব দিয়েছেন তিনি কি একদিন এটুকুও জিজ্ঞেস করবেন না যে, “আমার কথামতো দুনিয়ায় কাজ করেছ কি না?


. ৩৩-৩৭ আয়াতে আখিরাতে একেবারে বাস্তব ছবি তুলে ধরা হয়েছে। দুনিয়ার জীবনে যার যেমন খুশী চলার পর মৃত্যুর পরপারে হাশরের ময়দানের অবস্থা কেমন হবে এখানে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়েছে। দুনিয়ার জীবনে বিবি-বাচ্চা, বাপ-মা ও ভাই-বন্ধুরা একে অপরের মহব্বতে অন্ধ হয়ে তাদের সুখ-সুবিধার জন্য অথবা তাদের দাবী পূরণের জন্য আল্লাহর অবাধ্য হয়


কিন্তু হাশরের ময়দানে এদের পারস্পরিক মহব্বত খতম হয়ে যাবে। সেখানে এরা একে অপর থেকে পালাবে। নিজের অবস্থা নিয়েই প্রত্যেকে এমন পেরেশান থাকবে যে, আর কারো কথা চিন্তা করার হুঁশই থাকবে না। বরং বিবি-বাচ্চার মতো নিকট আত্মীয়দের কারণে বিপদ বেড়ে যাবার ভয়ে সবাই সবার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াবে


. ৩৮-৪২ আয়াতে বলা হয়েছে যে, হাশরের ময়দানে সবার অবস্থা একরকম হবে না। দুনিয়ায় যেমন সবার অবস্থা একরকম ছিল না, সেখানেও একরকম হতে পারে না। এক ধরনের লোকের চেহারা উজ্জ্বল হবে, তাদের মুখে হাসি-খুশী লেগেই থাকবে এবং তাদেরকে খুবই সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত মনে হবে। আর এক ধরনের লোকের চেহারা মলিন, কালিমাখা ও হতাশাগ্রস্ত থাকবে। বলা বাহুল্য, দুনিয়ায় যারা কাফির ও পাপী, তারা এখানে যত মজাই করে থাকুক এবং তাদের চেহারা যত সুন্দরই থাকুক হাশরে তাদের চরম দুর্দশা অবশ্যই হবে


বিশেষ শিক্ষা

দুনিয়ার জীবনে মানুষ বিবি-বাচ্চা, বাপ-মা ও ভাই-বন্ধুদেরকে খুশী করার জন্য এবং তাদের সুখ-সুবিধার জন্য আল্লাহর কত আদেশ-নিষেধ অমান্য করে থাকে। অনেক সময় তাদের জন্য মানুষ ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধাও কুরবান করে দেয়। এসব ঘনিষ্ঠ লোকের মহব্বত এমন অন্ধ বানিয়ে দেয় যে, তাদের দুনিয়া বানাবার জন্য অনেকেই নিজেদের আখিরাতকে বরবাদ করে দেয়। হাদীসে এ জাতীয় লোকদেরকে সবচেয়ে দুর্ভাগা বলা হয়েছে


এ সূরার ৩৩-৩৭ আয়াতে সাবধান হবার জন্য জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ঐ সব ঘনিষ্ঠ মহব্বতের পাত্র-পাত্রীদের আচরণ আখিরাতে কেমন হবে। বলা হয়েছে যে, যাদের সুখ-সুবিধার জন্য দুনিয়ায় হালাল-হারামের পরওয়া না করে কামাই-রোযগারে লিপ্ত রয়েছ, তারা আখিরাতে তোমার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াবে। তোমার হারাম কামাই খেয়ে তারা দুনিয়ায় যত সুখ-সুবিধাই ভোগ করে থাকুক, আখিরাতে তারা কেউ তোমার পাপের ভাগী হতে রাযী হবে না 


এ সূরার পরের সূরা আল-ইনশিক্কাকের ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, নেক লোক যখন তার আমলনামা ডান হাতে পাবে, তখন সে তার আত্মীয়-স্বজনের কাছে খুশী প্রকাশ করার জন্য এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ আত্মীয়দের মধ্যে যারা নেক, তারা আখিরাতে একে অপর থেকে পালিয়ে বেড়াবে না, বরং একে অপরকে দেখে খুশী হবে। কিন্তু যারা পাপী, তারা সবাই একে অপর থেকে দূরে সরে যাবে। তারা ভয় করবে যে, না জানি তার বাপ-ভাইদের পাপের বোঝা তার মাথায়ও এসে পড়ে

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow