মক্কা বিজয়: রহস্য, ষড়যন্ত্র ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাপ্রবাহ!

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মক্কা বিজয়ের জন্য গোপনে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কারণ তিনি চেয়েছিলেন যুদ্ধটি মুশরিকদের জন্য অপ্রত্যাশিত হয় এবং তারা প্রস্তুতি নিতে না পারে। হুদাইবিয়ার সন্ধি ভঙ্গের পর, মক্কার মুশরিকরা বনু খোজা গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ করে, যারা মুসলমানদের বন্ধু ছিল। এই আক্রমণটি সন্ধি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মক্কা বিজয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি গোপন রেখেছিলেন কারণ তিনি মনে করতেন এটি তাকে একটি সামরিক সুবিধা দেবে। তিনি সারা নামক একজন মহিলাকে মক্কার নেতাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন যাতে তাদের আসন্ন আক্রমণ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। মক্কার নেতারা চিঠিটি গোপন রাখতে ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সৈন্যরা মক্কায় পৌঁছানোর আগে তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারে। এই ঘটনাটি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর নীতিজ্ঞান ও কৌশলের একটি উদাহরণ তুলে ধরে এবং মুসলমানদের বিশ্বাস ও ঈমানের প্রতি অনুপ্রাণিত করে।

Apr 23, 2024 - 16:00
Apr 23, 2024 - 01:08
 0  18
মক্কা বিজয়: রহস্য, ষড়যন্ত্র ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাপ্রবাহ!
মক্কা বিজয়: রহস্য, ষড়যন্ত্র ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাপ্রবাহ!

রাসূল (সাঃ) যে কারনে মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি গোপন রেখেছিলেন!

আল্লাহর রাসূল মক্কা বিজয় করবেন এটা তিনি গোপন রেখেছিলেন। বিশিষ্ট কিছু সাহাবী একান্ত ঘনিষ্ঠ তারা জানতেন যে আল্লাহর রাসূল মক্কা বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু আম সাহাবীদের এই বিষয়টা জানতে দেওয়া হয়নি। তার কারণ এটা জানাজানি হয়ে গেলে, যুদ্ধটা ভয়ঙ্কর হবে ওদের প্রস্তুতিটা অনেক মারাত্মক হবে। এজন্য আল্লাহর রাসূল তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সেনাপতি তিনি মক্কা বিজয়ের জন্য যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এটা তিনি গোপন রেখেছিলেন। আর হুদাইবিয়ার সন্ধিতে বলা ছিল, আমরা দশ বছরের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করবে না


আর মক্কা বিজয় টা হল হুদাইবিয়ার সন্ধির মাত্র ২ বছর পরে। কেন হলো? যে মক্কার মুশরিকরা সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করেছিল। এই সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করার পরে, আল্লাহর রাসূল তাদের মধ্যে অভিযান চালাবেন, এটা তিনি গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে বলা ছিল, যে ছোট ছোট দলগুলি, ইচ্ছে করলে কোরাইশদের সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে, ইচ্ছে করলে মোহাম্মদ ((সাঃ) ) এর সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে। তো এই প্রস্তাবে, বন বকর কুরাইশদের সাথে বন্ধুত্ব করেছিলআর বনু খোজা এরা মোহাম্মদ (সাঃ)  এর সাথে বন্ধুত্ব করেছিল। কিন্তু হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হওয়ার অল্প দিন পরেই, এ বনু বকর ও বনু খোজা দুই দলের যুদ্ধ লাগলো। 


এই যুদ্ধ লাগার পরে বনু বকর হলো কুরাইশদের বন্ধু আর বনু খোজা মুসলমানদের বন্ধু। নবু বকর এসে বনু খোজার উপর আক্রমণ করল। আর কুরাইশরা গোপনে তাদের সাহায্য করলো। এতে বনু খোজার অনেক লোক হতাহত হল। তারা এসে আল্লাহর রাসূলের কাছে অভিযোগ করল ইয়া রাসুল আল্লাহ, তারা শুনলে ভঙ্গ করে আমাদের বিরুদ্ধে বনু বকরকে সাহায্য করেছে আমাদের বহু লোক হতাহত হয়েছে


আমরা কাবা ঘরে প্রবেশ করেও আত্মরক্ষা করতে পারিনি। এটা শোনার পরে আল্লাহর রাসূল আবু সুফিয়ান কে জানালেন, যে তোমরা আমাদের বনু খাজা আমাদের বন্ধু দল, এদের যে লোকগুলো হত্যা করেছ, এই প্রত্যেকটা মানুষের পরিবর্তে ব্লাডমানি ১০০টা উট আমার কাছে জমা দাও। যদি জমা না দাও  তাহলে মনে কর যে হুদায়বিয়ার সন্ধি শেষ। এখন ওরা দেখে যে অনেক লোক মারা গেছে। এতগুলো লোকের ব্লাডমানি রক্তের মূল্য, পরিশোধ করা আমাদের কাছে কঠিন। তখন ওরা বলে যে না এটা আমরা পারবো না


এতগুলো লোকের রক্তের মূল্য, আমরা দিতে পারবো না যদি হুদায়বিয়ার সন্ধি শেষ হয় হোক। এটা শোনার পর আল্লাহর রাসূল আলহামদুলিল্লাহ বললেন আচ্ছা ঠিক আছে। এরপর থেকে আল্লাহর রাসূল মক্কা বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু এটা আল্লাহর আসল গোপন রেখেছিলেন এ প্রস্তুতি সম্পর্কে কাউকে জানতে দেন নাই। এর কিছু পর মক্কা লোকেরা বুঝতে পারল, আমরা এত যুদ্ধ করে মুসলমানদের কিছু করতে পারলাম না, এখন হুদাইবিয়ার সন্ধি যদি ভঙ্গ হয়ে যায়, তাহলে মুসলমানরা যদি আমাদের শহরে আক্রমণ করে, আমরা তাদের সাথে হয়তো পারবো না


তখন ওরা আবার আবু সুফিয়ান কে বলে, “মদিনায় পাঠালো। যে আপনি গিয়ে মোহাম্মদ (সাঃ)  এর সাথে আলাপ করেন, যে হুদাইবিয়ার সন্ধিটা যেন আমরা পুনর্জীবিত করতে পারি.” এটার জন্য ওরা আবু সুফিয়ান কে মদিনায় পাঠালো। এরপর আবু সুফিয়ান মদিনায় আসলো প্রথমে তার কন্যা উম্মে হাবিবা আল্লাহর রাসূলের স্ত্রীর গৃহে প্রবেশ করল। উম্মে হাবিবা তার বাবা কে দেখে বিছানাটা গুটিয়ে ফেলল। এরপর আবু সুফিয়ান বলল মা এটা কি করলে তুমি বিছানাটা গুটিয়ে ফেললে? আমি কি এই বিছানার উপযুক্ত না? নাকি বিছানা আমার উপযুক্ত না? তখন উম্মে হাবিবা বললেন আপনি নাপাক আপনি মুশফিক আল্লাহর রাসূলের বিছানায় আপনার বসার অধিকার নেই।”


তখন আবু সুফিয়ান খুবই লজ্জিত হল মেয়ের কাছে যেয়েওখান থেকে বের হয়ে এসে আবু বক্কর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহ কাছে গেল, তার কাছেও কোন সুবিধা করতে পারল না। এরপর ওমর ফারুক এর কাছে গেল সে তো ভয়ঙ্কর, আর যদি কিছু না পাই একটা কাঠ নিয়ে হলেও তোমার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করবো। এরপর হযরত আলী রাঃ কাছে গেল সেখানেও কিছু লাভ হলো না। তখন আলী রাদিয়াল্লাহ বললেন আপনি মদিনার মসজিদের কাছে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা দাবি করেন, যে আপনাকে যেন তারা নিরাপত্তা দেয় এরপর আপনি চলে যান। আবু সুফিয়ান এভাবে পালিয়ে চলে গেল হুদাইবিয়ার সন্ধির কোন কিছুই হলো না। এই সুযোগে আল্লাহর রাসূল মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি নিলেন


এরপর যে ঘটনাটা ঘটলো তা হল, সারা নামক একজন মহিলা সে গায়ক ড্যান্সার এবং সিঙ্গার নাচ গান করায় তার পেশা। এই মহিলা মদিনায় আসছে, এসে আল্লাহর রাসূলের সাথে দেখা করছে। আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি মুসলমান হয়েছো? সে বলে না। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন তুমি কি হিজরত করেছ? সে বলে না। তাহলে তুমি কেন আসছো? তখন সে বলে এ কারণে আসছি যে আমার অভাব, আমি আপনাদের কাছ থেকে খাদ্য পোশাক চাই।” আল্লাহর রাসূল কে বললেন যেহেতু আমি আপনাদের বংশের আজাদকৃত দাসী


আপনাদের বংশের আমি দেশে ছিলাম, আপনাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। তখন আল্লাহর রাসূল বনি মোতালিব কে ডেকে বললেন, এই মহিলাকে তোমরা যে যা পারো সাহায্য কর। এই মহিলাকে সাহায্য করা হলো, এখন এই মহিলা মক্কায় চলে যাবে। তখন হাতেম ইবনে আবি বোলতা একজন ভাল সাহাবী বদরী সাহাবী। এ হাতেম ইবনে আবি বোলতা ওনার পরিবার-পরিজন ছিল মক্কায়। এবং উনি জানতেন আল্লাহর রাসূল মক্কা বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরপর এই সাহাবী হাতেম ইবনে আবি বোলতা করলো কি, দশটার স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ওই সারা নামক মহিলাকে একটা চিঠি দিল, এই চিঠিটা তুমি মক্কার নেতাদের কাছে পৌঁছে দিবা


দশটা স্বর্ণ মুদ্রা দিল আর একটা পোশাক দিল। দিয়ে গোপনে বলল, যে তুমি এই সিডিটা তুমি মক্কার নেতাদের কাছে পৌঁছে দিবে। এই চিঠিতে বলা ছিল, মোহাম্মদ (সাঃ)  আপনাদের উপর আক্রমণ করবে এটা অনিবার্য। এ ব্যাপারে আপনারা যা প্রস্তুতি নেওয়ার নিতে পারেন। আর আমার পরিবার-পরিজন যেহেতু আপনাদের মাঝে আছে তাদেরকে রক্ষা করবেন। তার উদ্দেশ্য ছিল পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করা। তো এই চিঠি নিয়ে সারা নামক মহিলা যখন যাচ্ছিল, তখন জিব্রাইল আমিন এসে আল্লাহর রাসূলকে বলে দিলেন


এরপর আল্লাহর রাসূল, হযরত আলী, মেঘদাত (রাঃ) তালহা (রাঃ) (জুবায়ের রাঃ) চারজন সাহাবীকে বললেন যে তোমরা সোজা মক্কার পথে ঘোড়া ছুটিয়ে যাও। তোমরা রওজায় খাক নামক জায়গাতে সারা নামক মহিলাকে পাবে, তার কাছে একটা চিঠি আছে ওটা নিয়ে আসবে। সে যদি দিতে রাজি না হয় তাহলে তাকে হত্যা করবে। এরপর এই চারজন খাওয়াবি ঘোড়া ছুটিয়ে সেখানে গেল এবং ওই মহিলাটিকে ওখানে পেল। তারপর মহিলাকে জিজ্ঞেস করল তোমার কাছে একটা চিঠি আছে ওটা আমাদের দাও। তখন ওই মহিলা বলল না আমার কাছে কোন চিঠি নাই। এখন তার মাল আসবাবপত্র সবকিছু অনুসন্ধান করা হলো, কিন্তু চিঠি পাওয়া যাচ্ছে না


তখন আলী রাঃ বললেন আল্লাহর রাসূল কখনো মিথ্যা কথা বলে না, তুমি যদি চিঠি না দাও তোমার পোশাক খুলব এরপর তোমাকে হত্যা করব। তখন ঐ মহিলা ভয় পেয়ে গেল, তারপর তার চুলের মধ্যে চিঠিটা লুকানো ছিল ওখান থেকে বের করে দিল। আল্লাহর রাসূলের আদেশ ছিল চিঠিটা পেলে তাকে কিছু করবে না, তাকে যেতে দিবে। এভাবেই চারজন সাহাবী চিঠিটা উদ্ধার করে নিয়ে আসলো, এরপর আল্লাহর রাসূল হাতেম ইবনে আবি বোলতা কে ডেকে বললেন, এই চিঠি কার? তখন সে বলল, যে হুজুর এটা আমার চিঠি। কি করছো তুমি? তখন সে বলে, ইয়া রাসুল আল্লাহ মোনাফেক হয় নাই, ঈমান ও ত্যাগ করি নাই, কিন্তু আমার পরিবার-পরিজন মক্কায় তাদের দেখাশোনার কেউ নেই


কাজেই এই যুদ্ধের মধ্যে আমার পরিবার পরিজনকে যেন তারা দেখে, এ কারণে আমি এই চিঠিটা দিয়েছি। ওমর ফারুক রেগে গেলেন ইয়া রাসুল আল্লাহ হুকুম দেন আমি ওকে হত্যা করব। তখন আল্লাহর রাসূল বললেন, যে উমর তুমি অপেক্ষা কর তুমি বোঝো এ লোকটা কিন্তু বদরী সাহাবী। বদরের যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের একটা স্পেশাল মর্যাদা আছে। এবং হাতেম ইবনে আবি বোলতা উহুদের যুদ্ধে কেমন ভূমিকা পালন করেছিলেন, আল্লাহর রাসূলকে যে পাথর মেরেছিল উথবা ইবনে আবি আক্কাস সে পাথর মেরেছিল আল্লাহর রাসূলের একটা দান্দান শহীদ হয়েছিল


উথবা ইবনে আবি আক্কাস কে হাতেম ইবনে আবি বোলতা হত্যা করেছে, এমন ভাবে তরোয়াল মেরেছে যে, কাধ থেকে তরোয়াল মেরে দুই ভাগ করে ফেলেছিল। আল্লাহর রাসুল হযরত ওমরকে বললেন ওমর তুমি ধৈর্য ধরো এটা বদরী সাহাবীএরপর আল্লাহর রাসূল হাতেম ইবনে আবি বোলতা কে ক্ষমা করে দিলেন। সূরা মুমতাহিনা ১নং আয়াতের তাফসিরে এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow